পণ্যের বাড়তি দরে চাপে ভোক্তা

করোনা পরিস্থিতির মধ্যে মানুষের সীমিত চলাচল ও আজ থেকে শুরু রমজান। এর মধ্যেও বাজারে সব ধরনের পণ্যের সরবরাহ ও মজুত পরিস্থিতি চাহিদার চেয়ে বেশি রয়েছে। তারপরও বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে।

গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিভিন্ন পণ্যের দাম গড়ে ৩ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রোজায় যেসব পণ্যের চাহিদা বেশি রয়েছে। এদিকে রোজা ও বিধিনিষেধের মধ্যে নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। খোলা হয়েছে বিশেষ মনিটরিং সেল। একইসঙ্গে সরকারি সংস্থাগুলোর তদারকিও জোরদার করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট তদারকির অফিসগুলো খোলা থাকবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাজারে পণ্যের চাহিদার চেয়ে বেশি সরবরাহ ও মজুত থাকার পর দাম বাড়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণে দাম বাড়ছে বলে তারা অভিযোগ করেছেন। রমজানকে ঘিরে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অতি মুনাফা করতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়েই যাচ্ছেন।

বাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুমাস আগ থেকেই চাল, ডাল, ছোলা, বেসন, চিনি, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, মরিচ, আদা-রসুন, সব ধরনের মাংস, খেজুর ও একাধিক ফলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ রোজা শুরুর এক থেকে তিন দিন আগেই রোজায় ব্যবহৃত সবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরেক দফা বাড়ানো হয়েছে।

ফলে এসব পণ্য কিনতে বাজারে রীতিমতো ভোক্তার নাভিশ্বাস উঠছে। বাড়তি দামের কারণে তারা চাপে পড়েছেন। ফলে চাহিদার তুলনায় পণ্য কম কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। মঙ্গলবার রাজধানীর কাওরানবাজার, মালিবাগ কাঁচাবাজার, নয়াবাজার ও রাজধানীর কেরানীগঞ্জ জিনজিরা কাঁচাবাজার ঘুরে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে আলুর দাম ২ টাকা বেড়ে ২৪ টাকা, সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি ৫ টাকা বেড়ে ১৬৫ টাকা ও গরুর মাংসে ২০ টাকা বেড়ে ৬২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

বোতলজাত পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেলে ১০ টাকা বেড়ে ৬৬০ টাকা, মসুর ডাল ১০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা, দেশি পেঁয়াজ ৫ টাকা বেড়ে ৪৫ টাকা ও আদা ২০ টাকা বেড়ে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে করোনা পরিস্থিতি ও রমজানে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বাজার তদারকিতেও সরকারের একাধিক সংস্থা মাঠে কাজ করছে।

সঙ্গে সারা দেশে টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে পণ্য বিক্রি কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য বছরের তুলনায় টিসিবি এবার বেশি পণ্য বিক্রি করছে। তবে সরকারের এত উদ্যোগের পরও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পণ্যের দাম বাড়িয়েই যাচ্ছে।

বাজারের বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঙ্গলবার বেগুন ও শসা ৭০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৯০ টাকা ও দারুচিনি ৪৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।

ভোক্তারা বলছেন, সরকার বাজার তদারকিতে জনবল নিয়োগ করলেও তারা উদাসীন। যে কারণে বাজারে পণ্য সরবরাহ থাকার পরও বিক্রেতারা তাদের ইচ্ছেমতো দামে বিক্রি করছেন। যারা অনিয়ম করে তাদের শাস্তির আওতায়ও আনা হয় না। আর যাদের শাস্তির আওতায় আনা হয় তাদেরকে অল্প টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়। যে কারণে অসাধুদের তেমন একটা ভয় কাজ করে না।

রাজধানীর খুচরা বাজারে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক মাসের ব্যবধানে মোটা চাল কেজিতে দুই টাকা বেড়ে ৫২ টাকা, খোলা ময়দা ২ টাকা বেড়ে ৩৮ টাকা, খোলা সয়াবিন লিটারে ৪ টাকা বেড়ে ১২৫ টাকা, এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন ৫ টাকা বেড়ে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এককেজি প্যাকেটজাত গুঁড়া দুধের মধ্যে ডানো মাসের ব্যবধানে ২০ টাকা বেড়ে ৬৫০ টাকা, কেজিতে ৩ টাকা বেড়ে চিনি ৭২ টাকা ও ৫ টাকা বেড়ে ছোলা ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

রাজধানীর জিনজিরা বাজারের মুদি ব্যবসায়ী সাক্কুর আলম বলেন, রমজান ঘিরে সব পণ্যের দাম বেশি। পাইকাররা গত দুমাস থেকে ধীরে ধীরে সব কটি পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। গত সপ্তাহের তুলনায় নতুন করে রমজাননির্ভর পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। যে কারণে বাড়তি দরে এনে বাড়তি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে।

জানতে চাইলে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, মূলত কয়েকটা কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। এর মধ্যে একটি হলো, চাহিদার তুলনায় পণ্য সরবরাহ কম থাকা। তবে দেশে মজুত পরিস্থিতি ভালো। এ সময় অসাধুরা প্রতিবছরের মতো কৃত্রিমভাবে ঘাটতি দেখিয়ে দাম আরও বাড়াতে পারে। তাই সরকারের কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। প্রয়োজন হলে ভোক্তার স্বার্থে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে।

বাজার তদারকি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে নিয়মিত বাজার তদারকি হচ্ছে। কোনো অনিয়ম পেলে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে। এ ছাড়া এ ক’দিনের ঝটিকা অভিযানে একাধিক পণ্যের দাম কমতে শুরু করেছে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।

আর রমজান ঘিরে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। কোনো পণ্যের ঘাটতি হওয়ার আশঙ্কা বা কারণ নেই। কৃত্রিম উপায়ে কোনো পণ্যের সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *