মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়েছে। ইরানের সাম্প্রতিক হামলার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের চালানো বিমান হামলার প্রতিবাদে শুক্রবার (২০ জুন) তেহরান, বাগদাদ, বৈরুতসহ বেশ কয়েকটি শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। জুমার নামাজের পর সংগঠিত এই বিক্ষোভে শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকেও তীব্রভাবে আক্রমণ করা হয়। অনেকের চোখে এটা ছিল শুধু প্রতিবাদ নয়, এক ধরনের প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা।
তেহরানের গর্জন
ইরানের রাজধানী তেহরানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত দৃশ্যে দেখা যায়, শহরের কেন্দ্রে লাখো মানুষের ঢল। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল ইরান ও হিজবুল্লাহর পতাকা, অনেকেই নিহত বিপ্লবী গার্ডদের ছবি বহন করছিলেন। “আমার নেতা আমার প্রাণ”—এই স্লোগানে মুখর ছিল রাজপথ। এখানকার বিক্ষোভ শুধু আবেগনির্ভর নয়, ছিল রাজনৈতিকভাবে সুসংগঠিত।
জুমার নামাজ পরিচালনাকারী ইমাম মোহাম্মদ জাওয়াদ হাজ আলী আকবারি খুতবায় বলেন, “ইসরায়েল হতাশা থেকে ইরানকে আক্রমণ করেছে। তারা আমাদের জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চায়। এটা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।”
তিনি আরো বলেন, “তাদের পরিকল্পনা নিখুঁত মনে হলেও, তাদের হিসাব ছিল হাস্যকর। কারণ ইরান এখন ঐক্যবদ্ধ।” ইমামের বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, সরকার এই প্রতিবাদকে ‘জাতীয় প্রতিরোধের শক্তি’ হিসেবে গণ্য করছে।
তেহরানের বাইরেও উত্তেজনার কমতি ছিল না। তাবরিজ, শিরাজ, ইসফাহানসহ ইরানের বহু শহরে ছিল একই ধরনের বিক্ষোভ। যেকোনো যুদ্ধ বা হামলার ঘটনায় সাধারণত সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠলেও এবার ইরানিরা সরকারি অবস্থানের পাশেই দাঁড়িয়েছে।
বাগদাদে মোক্তাদা অনুগতদের ক্ষোভ
ইরাকের রাজধানী বাগদাদেও জুমার নামাজের পর শহরের প্রধান শিয়া অধ্যুষিত সদর সিটি এলাকায় বিশাল বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। ইরাকের প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা মোক্তাদা সদর-এর অনুগতরা এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন। হাজার হাজার মানুষ হাতে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় নামে, যাতে লেখা ছিল, “ইসরায়েল ও আমেরিকা—মধ্যপ্রাচ্যের দুই আগ্রাসী শক্তি”।
একজন ট্যাক্সিচালক, যিনি নিজেকে আবু হুসেইন নামে পরিচয় দেন, বলেন, “এটা একটি অন্যায় যুদ্ধ। ইসরায়েলের কোনো অধিকার নেই ইরানকে আক্রমণ করার। তাদের লক্ষ্য পারমাণবিক কর্মসূচি নয়, বরং গোটা অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা।”
বাগদাদের বাইরেও, বিশেষ করে কুফা শহরে প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় নেমে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা পুড়িয়ে প্রতীকী প্রতিবাদ জানান। এসব শহর ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাববলয়ের অন্তর্ভুক্ত বলে পরিচিত।
ইরাক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো এই আন্দোলনকে সমর্থন না করলেও, ইরানি সমর্থিত বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী ইতোমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে—যদি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরায়েলের পক্ষে যুদ্ধে নামে, তাহলে তারা আমেরিকান স্বার্থে হামলা চালাবে।
বৈরুতে হিজবুল্লাহর বার্তা
লেবাননের রাজধানী বৈরুতেও বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে শহর। বিশেষ করে শহরের দক্ষিণাঞ্চল, যা হিজবুল্লাহর ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত, সেখানেই বিক্ষোভের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি ছিল। শত শত মানুষ ইরান, হিজবুল্লাহ ও লেবাননের পতাকা হাতে নিয়ে রাজপথে নামে। কারও কারও হাতে খামেনির ছবি ছিল, আবার কেউ কেউ “জায়নবাদ ধ্বংস হোক” লেখা ব্যানার বহন করছিল।
৬০ বছর বয়সী আদনান জায়তুন বলেন, “জায়নবাদী শত্রুর বিরুদ্ধে ইরানের পাশে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব।” আরেক বিক্ষোভকারী, ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ফাদেল সাআদ বলেন, “আমরা এসেছি আমেরিকা ও ইসরায়েলকে দেখাতে যে, আমরা অপরাজেয়। আমাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু মনোবল নয়।”
যদিও হিজবুল্লাহ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও ইরানের হয়ে যুদ্ধে নামার ঘোষণা দেয়নি, তবে তাদের সামরিক প্রস্তুতি ও স্লোগান স্পষ্ট করছে—যুদ্ধের সম্ভাবনা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
ইয়েমেনে লাখো মানুষের রাস্তায় নামা
ইরান সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনেও ছিল বিক্ষোভের ভয়াবহ চিত্র। রাজধানী সানায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। হুথি মিডিয়ার দাবি অনুযায়ী, শুধু সানাতেই অংশ নেয় কয়েক লাখ মানুষ। ‘ইসরায়েল ধ্বংস হোক’—এই স্লোগানে একযোগে মুখর ছিল সমগ্র শহর।
হুথি নেতারা একে ‘জিহাদি দায়িত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তারা যেকোনো সময় সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-আশঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
গত সপ্তাহে ইসরায়েল ইরানের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় আকাশ হামলা চালায়। এর পাল্টা জবাবে তেহরান ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরায়েল লক্ষ্য করে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে প্রকাশ্যে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে এখনো সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তবে যেকোনো মুহূর্তে তারা সক্রিয় হস্তক্ষেপ করলে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে যুদ্ধের আগুন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি আর শুধুমাত্র ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে দ্বন্দ্ব নয়। বরং, এটি এখন একটি গ্লোবাল ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিচ্ছে, যেখানে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশ্বজুড়ে মুসলিম জনমত ঐক্যবদ্ধ
বিশ্বজুড়ে মুসলিম সমাজ এই ইসরায়েলবিরোধী আন্দোলনে একধরনের ঐক্য দেখাচ্ছে। তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কাতারসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশের জনগণ ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। যদিও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এসব দেশের প্রতিক্রিয়া নরম ও কূটনৈতিক, জনমত অনেক বেশি র্যাডিক্যাল।
বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “#StandWithIran” এবং “#DownWithIsrael” হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আন্দোলনের মাত্রা শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটা পশ্চিমা দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, বিশেষ করে যেখানে বিশাল মুসলিম অভিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে।
অস্থিরতার দিকে এগোচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য
তেহরান, বাগদাদ, বৈরুত, সানা—সবখানেই এখন বারুদের গন্ধ। বিক্ষোভের উত্তাপ কেবল রাস্তায় নয়, পৌঁছে গেছে কূটনৈতিক টেবিল, সামরিক ঘাঁটি এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে। একের পর এক উত্তেজনা, পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং যুদ্ধের সম্ভাবনা এখন গোটা অঞ্চলকে অস্থির করে তুলেছে।
এই আন্দোলনগুলো একদিকে যেমন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, অন্যদিকে এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ারও এক সম্ভাব্য সূত্রপাত।
বিশ্ব নেতৃত্বের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ—এই আগুনকে তারা কিভাবে নিভাবে, নাকি পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে দেবে।






