রবীন্দ্রনাথকে লিখে ফেলবে এআই?

শাহিনা মণি

প্রকাশ :

ছবি: সংগৃহীত

কখনও কি ভাবা গিয়েছে, ‘কবিতা লিখি’ বলে কলম নয়, কেউ টিপে দিল একটা বোতাম— আর পর্দায় ভেসে উঠল একটি ‘নতুন রবীন্দ্রনাথীয়’ কবিতা? এ কি তবে কবির শেষ আর কীবোর্ডের শুরু?

কবিখ্যাতি চিরকালই এক রহস্যময় সম্পদ। আর বাংলা ভাষায় কবিতা? যেন বাঙালির জিনে মিশে থাকা রোগ— সুকুমার রায়ের কথায়, এক ছোঁয়াচে ব্যাধি! কিন্তু সেই ব্যাধির ওষুধ কি আজ এসে গেছে প্রযুক্তির হাত ধরে?

একটা সময় ছিল যখন কবিরা ছিলেন শ্রদ্ধার আসনে। তিরিশের দশক থেকে শুরু হয়ে, ‘আধুনিক কবিতা’র দুর্বোধ্যতা রসিকতার বিষয় হয়ে ওঠে। সজনীকান্ত দাস থেকে শরদিন্দু, পরশুরাম থেকে সুনীল— কেউ রেহাই দেননি। আজ সেই জায়গাতেই এসে দাঁড়িয়েছে এক ভয়ংকর প্রতিযোগী— এআই, বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

এআই কি তবে কবিতার ‘ভবিষ্যৎ’?

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় এআই-এর লেখা একটি ‘এপ্রিল ফুল’ কবিতা ঘিরে শোরগোল পড়ে যায়। কেউ বলছেন মজার, কেউ বলছেন আতঙ্কের ইঙ্গিত! কবিতার কাঠামো ধরে ধরে লিখে ফেলছে ‘সনেট’, ‘ভিলানেল’ কিংবা ‘পান্তুম’— যদিও ভাবের গভীরতায় এখনও ফাঁক রয়ে গেছে। কিন্তু কে বলতে পারে, আগামী দিনে তা-ও পেরিয়ে যাবে না?

যন্ত্রকে যত ডেটা খাওয়ানো হবে, ততই সে শিখবে। শেক্সপিয়রের সনেট তো সে এখনই লিখতে পারছে, তাহলে সুধীন্দ্রনাথ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ— সবারই ‘নকল’ লেখা কি সময়ের অপেক্ষা?

‘ডিজিটালের শয়তান’-এর কবিতা বনাম মানব-মননের লড়াই

সত্তরের দশকের কবি রণজিৎ দাশ আগেই সতর্ক করেছিলেন— ভবিষ্যতের কবিতা পড়বে রোবট পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে শহরের কোণে বসা কেউ। আজ, সেই ভবিষ্যৎ যেন দরজায় কড়া নাড়ছে। তাঁর ‘ডিজিটালের শয়তান ও কবিতা’ প্রবন্ধে এই সংকট স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন— বাইনারি লজিক বনাম ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স-এর সংঘাত। তাঁর আশঙ্কা, যদি কবিরাই ‘ডিজিটাল শয়তান’-এর প্রলোভনে পড়ে যান, তবে মানব সৃজনশীলতার শেষ কোথায়?

যদিও তিনি বিশ্বাস করেন, আসল কবিতা মানে যে ‘জৈব চিন্তার মেধা ও অনুভূতির সম্মিলন’, তা কোনও এআই ছুঁতে পারবে না। তবে চ্যালেঞ্জটা বাস্তব।

“যন্ত্র লিখতে পারে, কিন্তু ভাবতে পারে না”— কবিদের প্রত্যয়

ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কবি অভীক মজুমদার বিষয়টিকে দেখছেন অন্যভাবে। তাঁর মতে, “এআই-র লেখা কবিতা হবে যেমন টিউটোরিয়াল গায়ক— কণ্ঠে সুর আছে, আত্মা নেই!” তাঁর দৃষ্টিতে কবিতা লেখা এক ধরনের পারফরম্যান্স, যেমন নাচ বা গান। আর সেই পারফরম্যান্সের সুখ, আনন্দ, অন্তর্জাগতিক অনুভব— একমাত্র মানুষই জানে।

তিনি আরও বলেন, “কেউ যদি কবিখ্যাতির লোভে এআই ব্যবহার করেন, করুন। কিন্তু তাই বলে কবিতা লেখা থেমে যাবে না। কারণ আসল কবিরা লিখে যান তাঁদের আত্মার ডাকে, বোতামের চাপে নয়।”

শেষ কথা: কবিতার ভবিষ্যৎ কি তবে যন্ত্রে বন্দি? নাকি, মানুষই শেষ হাসি হাসবে?

যন্ত্র হয়তো কাঠামো লিখতে পারে, ছন্দ মেলাতে পারে, এমনকি বড় কবির ছায়াতেও হাঁটতে পারে। কিন্তু যে হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসে, ‘একটা কবিতা’, সেটার উৎস কি কখনও সার্কিট হতে পারে?

সম্ভবত না। আর কবিরাও জানেন— কীবোর্ড যতই ছুটুক, হৃদয়ের কলমই চূড়ান্ত সত্য।

জনপ্রিয় সংবাদগুলো

রবীন্দ্রনাথকে লিখে ফেলবে এআই?

শাহিনা মণি

প্রকাশ :

সংগৃহীত

কখনও কি ভাবা গিয়েছে, ‘কবিতা লিখি’ বলে কলম নয়, কেউ টিপে দিল একটা বোতাম— আর পর্দায় ভেসে উঠল একটি ‘নতুন রবীন্দ্রনাথীয়’ কবিতা? এ কি তবে কবির শেষ আর কীবোর্ডের শুরু?

কবিখ্যাতি চিরকালই এক রহস্যময় সম্পদ। আর বাংলা ভাষায় কবিতা? যেন বাঙালির জিনে মিশে থাকা রোগ— সুকুমার রায়ের কথায়, এক ছোঁয়াচে ব্যাধি! কিন্তু সেই ব্যাধির ওষুধ কি আজ এসে গেছে প্রযুক্তির হাত ধরে?

একটা সময় ছিল যখন কবিরা ছিলেন শ্রদ্ধার আসনে। তিরিশের দশক থেকে শুরু হয়ে, ‘আধুনিক কবিতা’র দুর্বোধ্যতা রসিকতার বিষয় হয়ে ওঠে। সজনীকান্ত দাস থেকে শরদিন্দু, পরশুরাম থেকে সুনীল— কেউ রেহাই দেননি। আজ সেই জায়গাতেই এসে দাঁড়িয়েছে এক ভয়ংকর প্রতিযোগী— এআই, বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

এআই কি তবে কবিতার ‘ভবিষ্যৎ’?

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় এআই-এর লেখা একটি ‘এপ্রিল ফুল’ কবিতা ঘিরে শোরগোল পড়ে যায়। কেউ বলছেন মজার, কেউ বলছেন আতঙ্কের ইঙ্গিত! কবিতার কাঠামো ধরে ধরে লিখে ফেলছে ‘সনেট’, ‘ভিলানেল’ কিংবা ‘পান্তুম’— যদিও ভাবের গভীরতায় এখনও ফাঁক রয়ে গেছে। কিন্তু কে বলতে পারে, আগামী দিনে তা-ও পেরিয়ে যাবে না?

যন্ত্রকে যত ডেটা খাওয়ানো হবে, ততই সে শিখবে। শেক্সপিয়রের সনেট তো সে এখনই লিখতে পারছে, তাহলে সুধীন্দ্রনাথ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ— সবারই ‘নকল’ লেখা কি সময়ের অপেক্ষা?

‘ডিজিটালের শয়তান’-এর কবিতা বনাম মানব-মননের লড়াই

সত্তরের দশকের কবি রণজিৎ দাশ আগেই সতর্ক করেছিলেন— ভবিষ্যতের কবিতা পড়বে রোবট পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে শহরের কোণে বসা কেউ। আজ, সেই ভবিষ্যৎ যেন দরজায় কড়া নাড়ছে। তাঁর ‘ডিজিটালের শয়তান ও কবিতা’ প্রবন্ধে এই সংকট স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন— বাইনারি লজিক বনাম ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স-এর সংঘাত। তাঁর আশঙ্কা, যদি কবিরাই ‘ডিজিটাল শয়তান’-এর প্রলোভনে পড়ে যান, তবে মানব সৃজনশীলতার শেষ কোথায়?

যদিও তিনি বিশ্বাস করেন, আসল কবিতা মানে যে ‘জৈব চিন্তার মেধা ও অনুভূতির সম্মিলন’, তা কোনও এআই ছুঁতে পারবে না। তবে চ্যালেঞ্জটা বাস্তব।

“যন্ত্র লিখতে পারে, কিন্তু ভাবতে পারে না”— কবিদের প্রত্যয়

ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কবি অভীক মজুমদার বিষয়টিকে দেখছেন অন্যভাবে। তাঁর মতে, “এআই-র লেখা কবিতা হবে যেমন টিউটোরিয়াল গায়ক— কণ্ঠে সুর আছে, আত্মা নেই!” তাঁর দৃষ্টিতে কবিতা লেখা এক ধরনের পারফরম্যান্স, যেমন নাচ বা গান। আর সেই পারফরম্যান্সের সুখ, আনন্দ, অন্তর্জাগতিক অনুভব— একমাত্র মানুষই জানে।

তিনি আরও বলেন, “কেউ যদি কবিখ্যাতির লোভে এআই ব্যবহার করেন, করুন। কিন্তু তাই বলে কবিতা লেখা থেমে যাবে না। কারণ আসল কবিরা লিখে যান তাঁদের আত্মার ডাকে, বোতামের চাপে নয়।”

শেষ কথা: কবিতার ভবিষ্যৎ কি তবে যন্ত্রে বন্দি? নাকি, মানুষই শেষ হাসি হাসবে?

যন্ত্র হয়তো কাঠামো লিখতে পারে, ছন্দ মেলাতে পারে, এমনকি বড় কবির ছায়াতেও হাঁটতে পারে। কিন্তু যে হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসে, ‘একটা কবিতা’, সেটার উৎস কি কখনও সার্কিট হতে পারে?

সম্ভবত না। আর কবিরাও জানেন— কীবোর্ড যতই ছুটুক, হৃদয়ের কলমই চূড়ান্ত সত্য।