মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে খালাস দিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। মঙ্গলবার (২৭ মে) সকালে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ এ রায় দেন।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে মুক্তি পেলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আজহারকে ২০১৪ সালে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। তবে আপিল বিভাগ সেই রায় বাতিল করে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও রায়: মামলার দীর্ঘ শুনানি শেষে আপিল বিভাগ পর্যবেক্ষণে জানায়, উপস্থাপিত প্রমাণ ও সাক্ষ্য পর্যাপ্ত নয় বলে প্রমাণের অভাবে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আদালতের এ রায়ে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বার্তা আছে বলেও অভিমত দিয়েছেন আইনজীবীরা।
আজহারের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন বিশিষ্ট আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিক, ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিক ও ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন।
জামায়াতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া: রায় ঘোষণার সময় আপিল বিভাগ প্রাঙ্গণে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতারা। নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাসুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানসহ শীর্ষ নেতারা রায় শুনে প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “এটি ইনসাফের বিজয়”।
তারা আরও জানান, এই রায়ের মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার একজন নির্দোষ মানুষ অবশেষে মুক্তি পেলেন। আজহারুল ইসলামের মুক্তিতে এখন আর কোনো আইনগত বাধা নেই বলেও জানান তার আইনজীবীরা।
রায়কে ঘিরে প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক: এই রায় নিয়ে দেশে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একপক্ষ একে ন্যায়বিচারের জয় হিসেবে দেখছে, অপরপক্ষ বলছে, এতে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যুদ্ধাপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অন্যান্য মামলার দিকে নজর রাখছে সাধারণ মানুষ ও বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় যুদ্ধাপরাধ বিচারপ্রক্রিয়ায় নতুন প্রশ্ন ও নজির তৈরি করল। অনেকেই মনে করছেন, এখন অন্যান্য আপিল বিচারাধীন মামলাগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে আজহারের খালাস।
পেছনের গল্প ও মামলার ইতিহাস: ২০০৮ সালে এটিএম আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ওঠে। ২০১২ সালে তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র জমা দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০১৪ সালে ট্রাইব্যুনাল তাকে একাধিক অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে।
রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে আজহারুল ইসলাম। এরপর এক দশকের বেশি সময় ধরে শুনানি শেষে ২০২৫ সালের মে মাসে চূড়ান্ত রায় দেয় আপিল বিভাগ।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো সংবেদনশীল মামলায় সুপ্রিম কোর্টের এমন রায় বিচারব্যবস্থার ধারাকে এক নতুন মোড়ে নিয়ে গেল। এটিএম আজহারের মুক্তির পথ খুলে যাওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই রায় নিয়ে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠতে পারে।






