সাভারে চারশত বছর ধরে চলছে চড়ক পূজা

সাভার প্রতিনিধি

প্রকাশ :

ছবি: প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

সাভার প্রতিনিধি

হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব হচ্ছে ‘চড়ক ঘুরানো’। প্রায় ২৫-৩০ ফুট উঁচু সোজা একটি বৃক্ষকে বলা হয় ‘চড়ক গাছ’।পূজার জন্য ব্যবহৃত গাছটি সারা বছর ডুবিয়ে রাখা হয় আশপাশের পুকুরে। চৈত্র সংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখের দিনে ঢাকঢোল পিটিয়ে গাছটি উঠিয়ে আনা হয়। এরপর মাঠে চড়ক গাছটি পুঁতে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করা হয়। গাছের আগায় কাঠের সঙ্গে বাঁধা হয় দড়ি । সন্ন্যাসীরা স্নান করে নতুন ধুতি পরে মূল সন্ন্যাসীর কাছে মন্ত্র নেন। মন্ত্র শেষ হলে তাদের পিঠে লোহার বড়শি গেঁথে দেওয়া হয়। এরপর সে অবস্থায় তাকে বেঁধে রাখা কাঠের দুই প্রান্তে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

জানা যায়, সাভারের শিমুলিয়ায় গণকপাড়ায় চারশত বছর ধরে চলছে চড়ক পূজা। আশপাশে আরও কয়েকটি স্থানে পূজা থাকলেও এখানে সবচেয়ে পুরাতন। কথিত আছে চার পুরুষ আগে এই পূজার শুরু। খালি জায়গায় বসানো হয়েছে প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার চড়ক গাছ। পিঠে বড়শির গেঁথে এতে ঝুলছেন কেউ। কেউ আবার দিচ্ছেন উলুধ্বনি। ঢাক, কাসর, শাঁখের শব্দে মুখরিত চারপাশ। হিন্দু সম্প্রদায়ের আচার অনুষ্ঠান হিসেবে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের দিন চড়ক পূজার উৎসব। সারাদেশের মত সাভারে কয়েকটি স্থানে এই বিচিত্র আয়োজন দেখতে হিন্দু-মুসলমানসহ সব ধর্ম-সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষদের ঢল নামে।

মেলা ঘুরে দেখা যায়,শিবের নাম নিয়ে পিঠে বড়শি গেঁথে সন্ন্যাসীকে শূন্যে চারপাশে ঘুরানো হয়। এ সময় নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ভক্তরা তার দিকে ফুল, বাতাসা ছুঁড়ে দেন। একাধিক সন্ন্যাসী এই কাজ করেন। নারীদের উলুধ্বনি দিতে থাকেন। অপরদিকে সন্ন্যাসীরা শিব সতী সেজে নৃত্য করেন। ঢাক, কাঁসর, ঘণ্টা বাজিয়ে শিব সতীর বিয়ে সম্পন্ন করেন ভক্তরা। এই পূজা নির্দিষ্ট বর্ণ-সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে সকল বর্ণ-মতের হিন্দুদের উপস্থিতি দেখা যায়। এদিকে পহেলা বৈশাখের দিন থাকায় হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানুষজনের উপস্থিতি দেখা যায়। পূজাকে কেন্দ্র করে পাশেই চলে মেলার আয়োজন। চড়ক পূজা ও মেলা সবার কাছে উৎসবে রূপ দিয়েছে।

পূজাতে উপস্থিত থাকতে যশদেব তার পরিবারকে নিয়ে মিরপুর থেকে এসেছেন। তিনি জানান, এখানে প্রতিবছর আসার চেষ্টা করি। পাশেই আত্মীয় বাড়ি আছে। সেখানেই আসি। এখানে তো আমার পূর্বপুরুষদের সবাই এসেছে। শুনেছি প্রায় চারশত বছর আগেই থেকে শিব নামে চড়ক পূজার আয়োজন হয়।

পার্শ্ববর্তী থানা ধামরাই থেকে চৈত্র সংক্রান্তির আয়োজন দেখতে এসেছেন লক্ষণ দেব চৌধুরী ও তার স্ত্রী সাথী দেব চৌধুরী। তারা জানান, শিবের একটি পূজার অংশ এটি। প্রতি বছর আসতেই হয়। মনের ভেতর থেকে প্রার্থনা আসে। সবার মঙ্গল কামনা করে প্রতি বছর পূজাতে অংশ নেই।

তারা আরও বলেন, আশপাশে অনেকস্থানে এ আয়োজন হয় কিন্ত এই শিমুলিয়ার এটা অনেক পুরাতন। এ জায়গার মানুষদের সাথে চেনা হয়ে গেছে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছি তারাও ভবিষ্যতে এখানে আসবে। তারাও এ পূজার সাক্ষী হবে।

চারশত বছরের পুরাতন ঐতিহ্যবাহী পূজার আয়োজনে রয়েছে একটি কমিটি। সে কমিটির সদস্য রনি পাল বলেন, এই পূজা চারশত বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছে। চার পুরুষ এই পূজার আয়োজন করছে। আমরা ধারা রেখেছি। চৈত্রের শেষ দশদিন ধরে এই পূজা হয়।বৈশাখের প্রথম দু-তিন দিনব্যাপী চড়ক পূজার উৎসব চলে। এটি চৈত্র মাসে পালিত হিন্দু দেবতা শিবের গাজন উৎসবের একটি অংশ। এই উৎসবকে কেন্দ্র চড়ক সংক্রান্তির মেলা নামে বেশি পরিচিত।বর্তমানে এটি সব বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় পালন করে।

জনপ্রিয় সংবাদগুলো

সাভারে চারশত বছর ধরে চলছে চড়ক পূজা

সাভার প্রতিনিধি

প্রকাশ :

প্রতিনিধির পাঠানো ছবি

সাভার প্রতিনিধি

হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব হচ্ছে ‘চড়ক ঘুরানো’। প্রায় ২৫-৩০ ফুট উঁচু সোজা একটি বৃক্ষকে বলা হয় ‘চড়ক গাছ’।পূজার জন্য ব্যবহৃত গাছটি সারা বছর ডুবিয়ে রাখা হয় আশপাশের পুকুরে। চৈত্র সংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখের দিনে ঢাকঢোল পিটিয়ে গাছটি উঠিয়ে আনা হয়। এরপর মাঠে চড়ক গাছটি পুঁতে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করা হয়। গাছের আগায় কাঠের সঙ্গে বাঁধা হয় দড়ি । সন্ন্যাসীরা স্নান করে নতুন ধুতি পরে মূল সন্ন্যাসীর কাছে মন্ত্র নেন। মন্ত্র শেষ হলে তাদের পিঠে লোহার বড়শি গেঁথে দেওয়া হয়। এরপর সে অবস্থায় তাকে বেঁধে রাখা কাঠের দুই প্রান্তে দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

জানা যায়, সাভারের শিমুলিয়ায় গণকপাড়ায় চারশত বছর ধরে চলছে চড়ক পূজা। আশপাশে আরও কয়েকটি স্থানে পূজা থাকলেও এখানে সবচেয়ে পুরাতন। কথিত আছে চার পুরুষ আগে এই পূজার শুরু। খালি জায়গায় বসানো হয়েছে প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার চড়ক গাছ। পিঠে বড়শির গেঁথে এতে ঝুলছেন কেউ। কেউ আবার দিচ্ছেন উলুধ্বনি। ঢাক, কাসর, শাঁখের শব্দে মুখরিত চারপাশ। হিন্দু সম্প্রদায়ের আচার অনুষ্ঠান হিসেবে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের দিন চড়ক পূজার উৎসব। সারাদেশের মত সাভারে কয়েকটি স্থানে এই বিচিত্র আয়োজন দেখতে হিন্দু-মুসলমানসহ সব ধর্ম-সম্প্রদায়ের নারী-পুরুষদের ঢল নামে।

মেলা ঘুরে দেখা যায়,শিবের নাম নিয়ে পিঠে বড়শি গেঁথে সন্ন্যাসীকে শূন্যে চারপাশে ঘুরানো হয়। এ সময় নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ভক্তরা তার দিকে ফুল, বাতাসা ছুঁড়ে দেন। একাধিক সন্ন্যাসী এই কাজ করেন। নারীদের উলুধ্বনি দিতে থাকেন। অপরদিকে সন্ন্যাসীরা শিব সতী সেজে নৃত্য করেন। ঢাক, কাঁসর, ঘণ্টা বাজিয়ে শিব সতীর বিয়ে সম্পন্ন করেন ভক্তরা। এই পূজা নির্দিষ্ট বর্ণ-সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে সকল বর্ণ-মতের হিন্দুদের উপস্থিতি দেখা যায়। এদিকে পহেলা বৈশাখের দিন থাকায় হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে মানুষজনের উপস্থিতি দেখা যায়। পূজাকে কেন্দ্র করে পাশেই চলে মেলার আয়োজন। চড়ক পূজা ও মেলা সবার কাছে উৎসবে রূপ দিয়েছে।

পূজাতে উপস্থিত থাকতে যশদেব তার পরিবারকে নিয়ে মিরপুর থেকে এসেছেন। তিনি জানান, এখানে প্রতিবছর আসার চেষ্টা করি। পাশেই আত্মীয় বাড়ি আছে। সেখানেই আসি। এখানে তো আমার পূর্বপুরুষদের সবাই এসেছে। শুনেছি প্রায় চারশত বছর আগেই থেকে শিব নামে চড়ক পূজার আয়োজন হয়।

পার্শ্ববর্তী থানা ধামরাই থেকে চৈত্র সংক্রান্তির আয়োজন দেখতে এসেছেন লক্ষণ দেব চৌধুরী ও তার স্ত্রী সাথী দেব চৌধুরী। তারা জানান, শিবের একটি পূজার অংশ এটি। প্রতি বছর আসতেই হয়। মনের ভেতর থেকে প্রার্থনা আসে। সবার মঙ্গল কামনা করে প্রতি বছর পূজাতে অংশ নেই।

তারা আরও বলেন, আশপাশে অনেকস্থানে এ আয়োজন হয় কিন্ত এই শিমুলিয়ার এটা অনেক পুরাতন। এ জায়গার মানুষদের সাথে চেনা হয়ে গেছে। ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছি তারাও ভবিষ্যতে এখানে আসবে। তারাও এ পূজার সাক্ষী হবে।

চারশত বছরের পুরাতন ঐতিহ্যবাহী পূজার আয়োজনে রয়েছে একটি কমিটি। সে কমিটির সদস্য রনি পাল বলেন, এই পূজা চারশত বছর আগে থেকেই শুরু হয়েছে। চার পুরুষ এই পূজার আয়োজন করছে। আমরা ধারা রেখেছি। চৈত্রের শেষ দশদিন ধরে এই পূজা হয়।বৈশাখের প্রথম দু-তিন দিনব্যাপী চড়ক পূজার উৎসব চলে। এটি চৈত্র মাসে পালিত হিন্দু দেবতা শিবের গাজন উৎসবের একটি অংশ। এই উৎসবকে কেন্দ্র চড়ক সংক্রান্তির মেলা নামে বেশি পরিচিত।বর্তমানে এটি সব বর্ণের হিন্দু সম্প্রদায় পালন করে।