বাংলাদেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় আজ সোমবার সকাল থেকে উত্তাল হয়ে উঠেছে সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ বাতিলের দাবিতে। এই অধ্যাদেশে চাকরিজীবীদের চারটি ধরনের ‘শৃঙ্খলাভঙ্গ’ অপরাধের জন্য বিভাগীয় তদন্ত ছাড়াই কেবল কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে চাকরিচ্যুত করার বিধান রাখা হয়েছে, যা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে ‘অবৈধ কালো আইন’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সকাল ১১টার দিকে ‘বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদ’-এর সভাপতি মো. বাদিউল কবীর ও মহাসচিব নিজাম উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই মো. নূরুল ইসলাম ও মুজাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে পরিষদের আরেকটি অংশ মিছিলে যোগ দেয়। দুই পক্ষ একত্রিত হয়ে মিছিলের পরিধি বিস্তৃত করে তোলে।
বিক্ষোভকারীরা ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’, ‘অবৈধ কালো আইন মানি না মানবো না’, ‘এক হও, লড়াই কর—১৮ লাখ কর্মচারী’ ইত্যাদি স্লোগানে সচিবালয়ের আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তোলেন।
সচিবালয়ের কাজে স্থবিরতা: সচিবালয়ের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের কর্মস্থল ছেড়ে নিচে নেমে আসেন। এতে সচিবালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। কর্মকর্তারা জানান, এ অধ্যাদেশ কার্যকর হলে সরকারি চাকরি সেক্টরে চরম অনিশ্চয়তা ও ভয়ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি হবে।
একজন সিনিয়র সহকারী সচিব বলেন, “দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি চাকরির নিশ্চয়তা না থাকে, তাহলে প্রশাসনিক কার্যকারিতা কীভাবে বজায় থাকবে? এই আইন আমাদের মৌলিক অধিকার হরণ করে।”
আইন জারির প্রেক্ষাপট: রবিবার (২৫ মে) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে অধ্যাদেশটি গেজেট আকারে জারি হয়। এর আগে ২২ মে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সংশোধিত খসড়াটি অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে খসড়া অনুমোদনের দিন থেকেই সচিবালয়ের কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা বাড়তে থাকে, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আজকের সংগঠিত বিক্ষোভে।
টানা আন্দোলনের ঘোষণা: রবিবার সচিবালয়ের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী সংগঠন একাত্মভাবে বিক্ষোভ করে জানিয়ে দেয়, তারা এই ‘অবৈধ ও একতরফা’ অধ্যাদেশ বাতিল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবে। আজকের আন্দোলনের ব্যাপকতা দেখে অনুমান করা যাচ্ছে, আগামী দিনগুলোতে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে, যদি না সরকার দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে না আসে।
পর্যবেক্ষকরা যা বলছেন: প্রশাসন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের অধ্যাদেশে প্রশাসনের আত্মবিশ্বাস ধসে পড়ে। এক কর্মকর্তা বলেন, “সরকার যদি কর্মচারীদের পাশে না থাকে, বরং তাদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের নীতি নেয়, তাহলে প্রশাসন সরকারকে চালাবে কীভাবে?”
সরকারি চাকরিতে শৃঙ্খলা আনতে কিংবা প্রশাসন দক্ষ করতে আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে, তবে তা হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও মানবিক। সচিবালয়ের এই বিক্ষোভ প্রমাণ করে, সরকারের একতরফা সিদ্ধান্ত কতটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
সরকার কি এখন আলোচনার পথে হাঁটবে, নাকি চাপের মুখে আরও কঠোর মনোভাব নেবে—তা নির্ধারণ করবে আগামী দিনের আন্দোলনের গতি ও জনমত।






