স্বাস্থ্যঝুঁকিসারা দেশে ডিটারজেন্ট কারখানাগুলোর পরিবেশ ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পুরনো ম্যানুয়াল প্রযুক্তিতে পরিচালিত অধিকাংশ কারখানায় নেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা কিংবা দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এতে হাজার হাজার শ্রমিক চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট এমনকি ক্যান্সারের মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি ঢাকার সাভারের তেঁতুলঝোড়া এলাকায় অবস্থিত আরএসপিএল কোম্পানির ‘ঘড়ি’ ব্র্যান্ডের ডিটারজেন্ট কারখানাটি বন্ধ করে দিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে—কারখানাটির ভ্যাকুয়েশন সিস্টেম, ধুলা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না।
পরিদর্শনকারী টিমের সদস্য উপমহাপরিদর্শক মো. আতিকুর রহমান জানান, এই কারখানাটির কর্মপরিবেশ ভয়াবহভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল এবং কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছিল না। তিনি আরও বলেন, “দেশের অধিকাংশ ডিটারজেন্ট কারখানাই চলছে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে। ডাস্ট কালেক্টর, নিরাপত্তা গার্ড, অথবা দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই। শ্রমিকরা নিয়মিত বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে কাজ করছে।”
বিশেষজ্ঞরা জানান, ডিটারজেন্ট তৈরিতে ব্যবহৃত ফসফেট, ল্যাপসা, সার্ফ্যাক্ট্যান্ট ও ক্ষারীয় উপাদানগুলো মানবদেহের ত্বক ও শ্বাসনালীতে গুরুতর ক্ষতি করে। হাত ও মাথা দিয়ে এসব উপাদান সামলাতে গিয়ে শ্রমিকরা এলার্জি, শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ, ত্বক ফাটাসহ ক্যানসার পর্যন্ত আক্রান্ত হচ্ছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে প্রচলিত ডিটারজেন্টের অধিকাংশ উপাদান দীর্ঘমেয়াদে কিডনি, জেনেটিক মিউটেশন এবং চোখের জটিল সমস্যার কারণ হতে পারে। এমনকি এই ডিটারজেন্ট যদি পানিতে মিশে যায়, তা অতিবেগুনি রশ্মির সঙ্গে বিক্রিয়ায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানে রূপান্তরিত হতে পারে।
অবৈধতার অভিযোগ, গোপনে চালু কারখানা: শ্রম মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বন্ধ ঘোষণার পরদিনই ঘড়ি ডিটারজেন্টের সাভার কারখানা গোপনে আবার চালু করা হয়। কারখানাটি গাজীপুরের অনুমোদিত ইউনিটের এক্সটেনশন হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছিল। পরবর্তীতে সেটি আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সূত্র আরও জানায়, দেশের অনেক বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানেও ডিটারজেন্ট ইউনিটে একই রকম দূষণ ও অব্যবস্থাপনা চলছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কর্তৃপক্ষের নজরদারি একেবারেই দুর্বল।
বর্জ্যে দূষিত মাটি-পানি, ঝুঁকিতে জনগণ: মান্ধাতার আমলের এসব কারখানায় নেই কোনো কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ফলে কারখানা থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ আশপাশের মাটি, পানি এবং বাতাসে মারাত্মকভাবে দূষণ ছড়াচ্ছে। এতে শুধু শ্রমিকরাই নয়, আশপাশের এলাকাবাসীও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে দেশের শ্রমঘন শিল্প খাত বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
ডিটারজেন্ট কারখানাগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি শ্রমিকের স্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ—তিনটিকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। শিল্প মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে শুধুমাত্র লাভের জন্য কেউ মানুষ ও প্রকৃতির ক্ষতি করতে না পারে।






