দুই ইস্যুতে অনড় বিএনপি

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ :

ছবি: সংগৃহীত

সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দ্বিতীয় দিনের বৈঠকে বসেছে বিএনপি। আলোচনা গড়িয়েছে তৃতীয় দিনে, আর এতে দুটি বিষয়ে বিএনপি তাদের অনড় অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

প্রথমত, বিএনপি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—একই ব্যক্তি একযোগে দলপ্রধান, সরকারপ্রধান ও সংসদ নেতা হতে পারবেন না—এমন প্রস্তাবে তারা রাজি নয়। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী পদে টানা দুই মেয়াদের বেশি কেউ থাকতে পারবেন না—এই প্রস্তাবও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে তারা বলেছে, কেউ পরপর দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করলে এক বছরের বিরতির পর আবারও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন।

রোববার জাতীয় সংসদের এলডি কক্ষে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অনেক গণতান্ত্রিক দেশে দলপ্রধানই সরকারপ্রধান হয়ে থাকেন, যেমন—যুক্তরাজ্যে। সুতরাং, এটি গণতন্ত্রের পরিপন্থী নয়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণ ঠিক করবে কে সরকার গঠন করবে।

বিএনপি রাষ্ট্রপতির কিছু ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে, তবে তারা মনে করে, এসব বিষয় সংবিধানে না এনে আইন প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করা উচিত। এতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সহজে পরিবর্তন আনা যাবে।

সংসদে দুই কক্ষ (উচ্চ ও নিম্নকক্ষ) গঠন নিয়ে দলটি একমত হলেও, সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান। জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাবেও তারা দ্বিমত জানিয়েছে। বিএনপির মতে, এই কাউন্সিল গঠিত হলে প্রধানমন্ত্রী কার্যক্রমে বাঁধাগ্রস্ত হতে পারেন।

তারা চায়, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া হোক। একইসঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে থাকা ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’—এই তিনটি মূলনীতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে তারা মত দিয়েছে।

বিএনপি ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে থাকলেও তারা মনে করে, রাষ্ট্রের আর্থিক সামর্থ্য ও বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে মৌলিক অধিকার নির্ধারণ করা উচিত।

সংসদ সদস্যদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বিএনপি বলেছে, চারটি বিষয় ছাড়া (অর্থবিল, আস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধনী ও জাতীয় নিরাপত্তা) বাকি সব বিষয়ে এমপিদের স্বাধীনভাবে মত দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।

নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাবে বিএনপি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, এ বিষয়ে ভবিষ্যতে সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বশাসিত করার বিষয়ে বিএনপি নীতিগতভাবে একমত। তারা মনে করে, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত সব স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে শক্তিশালী আইন প্রণয়ন প্রয়োজন। এসব বিষয়ের বাস্তবায়ন সংবিধানে না এনে আইনের মাধ্যমে করা উচিত বলেও তারা মত দিয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিরোধিতা করেছে বিএনপি এবং চায় এটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হোক।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাবনায়ও তারা একই চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে বাকি বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার দেওয়ার কথা বলেছে।

‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব বিএনপি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, এ নামটি দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত এবং গণতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সংসদে এসে আইন প্রণয়ন ও ক্ষমতা প্রয়োগ করেন—এটাই এর মূল দর্শন।

বিএনপি জানিয়েছে, জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং আন্তরিকভাবে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।

এর আগে প্রথম দিনের বৈঠকে সংবিধানের প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, মৌলিক অধিকার ও আইনসভা নিয়ে আলোচনা হয়। দ্বিতীয় দিনে নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং পাঁচটি কমিশন নিয়ে কথা হয়। বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থার বিষয়ে আলোচনা এখনও বাকি, যা আগামী বৈঠকে সম্পন্ন হবে।

রোববারের বৈঠকে বিএনপির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও আবু মো. মনিরুজ্জামান খান। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। সঞ্চালনায় ছিলেন মনির হায়দার, এবং উপস্থিত ছিলেন বদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও সফর রাজ হোসেন।

বৈঠক শেষে জানানো হয়, আগামী মঙ্গলবার ফের আলোচনা বসবে এবং আশা করা হচ্ছে সেদিনই বিচার বিভাগসহ বাকি বিষয়ের আলোচনা সম্পন্ন হবে।

জনপ্রিয় সংবাদগুলো

দুই ইস্যুতে অনড় বিএনপি

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ :

সংগৃহীত

সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দ্বিতীয় দিনের বৈঠকে বসেছে বিএনপি। আলোচনা গড়িয়েছে তৃতীয় দিনে, আর এতে দুটি বিষয়ে বিএনপি তাদের অনড় অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

প্রথমত, বিএনপি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—একই ব্যক্তি একযোগে দলপ্রধান, সরকারপ্রধান ও সংসদ নেতা হতে পারবেন না—এমন প্রস্তাবে তারা রাজি নয়। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রী পদে টানা দুই মেয়াদের বেশি কেউ থাকতে পারবেন না—এই প্রস্তাবও তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে তারা বলেছে, কেউ পরপর দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালন করলে এক বছরের বিরতির পর আবারও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন।

রোববার জাতীয় সংসদের এলডি কক্ষে সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, অনেক গণতান্ত্রিক দেশে দলপ্রধানই সরকারপ্রধান হয়ে থাকেন, যেমন—যুক্তরাজ্যে। সুতরাং, এটি গণতন্ত্রের পরিপন্থী নয়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণ ঠিক করবে কে সরকার গঠন করবে।

বিএনপি রাষ্ট্রপতির কিছু ক্ষমতা বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছে, তবে তারা মনে করে, এসব বিষয় সংবিধানে না এনে আইন প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করা উচিত। এতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে সহজে পরিবর্তন আনা যাবে।

সংসদে দুই কক্ষ (উচ্চ ও নিম্নকক্ষ) গঠন নিয়ে দলটি একমত হলেও, সদস্য নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান। জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাবেও তারা দ্বিমত জানিয়েছে। বিএনপির মতে, এই কাউন্সিল গঠিত হলে প্রধানমন্ত্রী কার্যক্রমে বাঁধাগ্রস্ত হতে পারেন।

তারা চায়, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া হোক। একইসঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে থাকা ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’—এই তিনটি মূলনীতি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে তারা মত দিয়েছে।

বিএনপি ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে থাকলেও তারা মনে করে, রাষ্ট্রের আর্থিক সামর্থ্য ও বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে মৌলিক অধিকার নির্ধারণ করা উচিত।

সংসদ সদস্যদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বিএনপি বলেছে, চারটি বিষয় ছাড়া (অর্থবিল, আস্থা ভোট, সংবিধান সংশোধনী ও জাতীয় নিরাপত্তা) বাকি সব বিষয়ে এমপিদের স্বাধীনভাবে মত দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত।

নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার প্রস্তাবে বিএনপি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে। তারা বলেছে, এ বিষয়ে ভবিষ্যতে সংসদে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বশাসিত করার বিষয়ে বিএনপি নীতিগতভাবে একমত। তারা মনে করে, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত সব স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে শক্তিশালী আইন প্রণয়ন প্রয়োজন। এসব বিষয়ের বাস্তবায়ন সংবিধানে না এনে আইনের মাধ্যমে করা উচিত বলেও তারা মত দিয়েছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিরোধিতা করেছে বিএনপি এবং চায় এটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হোক।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাবনায়ও তারা একই চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে বাকি বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার দেওয়ার কথা বলেছে।

‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব বিএনপি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, এ নামটি দীর্ঘদিন ধরে স্বীকৃত এবং গণতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই সংসদে এসে আইন প্রণয়ন ও ক্ষমতা প্রয়োগ করেন—এটাই এর মূল দর্শন।

বিএনপি জানিয়েছে, জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগকে তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং আন্তরিকভাবে আলোচনায় অংশ নিচ্ছে।

এর আগে প্রথম দিনের বৈঠকে সংবিধানের প্রস্তাবনা, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, মৌলিক অধিকার ও আইনসভা নিয়ে আলোচনা হয়। দ্বিতীয় দিনে নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং পাঁচটি কমিশন নিয়ে কথা হয়। বিচার বিভাগ ও নির্বাচন ব্যবস্থার বিষয়ে আলোচনা এখনও বাকি, যা আগামী বৈঠকে সম্পন্ন হবে।

রোববারের বৈঠকে বিএনপির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন নজরুল ইসলাম খান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল ও আবু মো. মনিরুজ্জামান খান। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পক্ষে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। সঞ্চালনায় ছিলেন মনির হায়দার, এবং উপস্থিত ছিলেন বদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও সফর রাজ হোসেন।

বৈঠক শেষে জানানো হয়, আগামী মঙ্গলবার ফের আলোচনা বসবে এবং আশা করা হচ্ছে সেদিনই বিচার বিভাগসহ বাকি বিষয়ের আলোচনা সম্পন্ন হবে।