বিএনপি চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন এবং ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে।
শনিবার (২৪ মে) রাতে যমুনা ভবনে ড. ইউনূসের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে বিএনপির শীর্ষ নেতারা সাংবাদিকদের এসব কথা জানান। বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, “সংস্কারের কাজ দ্রুত শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ আমরা চেয়েছি। সেইসঙ্গে বিতর্কিত উপদেষ্টাদের সরিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছি।”
গণহত্যার বিচার দাবি অব্যাহত: ড. মোশাররফ আরও বলেন, “বিগত সরকারের আমলে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আমরা এই সরকারকে শুরু থেকেই বলে আসছি, যেসব গণহত্যা ঘটেছে, সেগুলোর বিচার চলমান থাকবে। নির্বাচিত সরকার এ বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।”
প্রধান উপদেষ্টার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা: বিএনপির আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, “এখনই প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় নয়। প্রধান উপদেষ্টার দফতর কী বলে, সেটাই আগে শোনা দরকার। তাদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করেই আমরা আমাদের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানাবো।”
তিনি জানান, নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ছাত্র উপদেষ্টাদের নিয়ে বিএনপি আগেও আপত্তি তুলেছে, আবারও লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। “এদের কারণে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে,” বলেন তিনি। “আজও লিখিত বক্তব্যে তাদের বাদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছি, মৌখিকভাবেও বলেছি।”
প্রধান উপদেষ্টা কি কোনও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন বলেন, “তিনি আশ্বাস দিয়েছেন বিষয়টি দেখা হবে। আমরা আমাদের বক্তব্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছি।”
সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব: বৈঠকে মূলত তিনটি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে—সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “সংস্কার বিষয়ে আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছি এবং উনারাও একমত হয়েছেন। যেখানে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্কার হওয়া দরকার, সেখানে তা দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “বিচার ব্যবস্থার দায়িত্ব বিচার বিভাগই পালন করবে। বিচার প্রক্রিয়ায় কারা আসবে—সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, এবং এখানেও ওনাদের (প্রধান উপদেষ্টার দফতর) কোনো দ্বিমত ছিল না।”
খসরুর দাবি, “ডিসেম্বরের আগেও নির্বাচন সম্ভব। বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে এবং তারা এ বিষয়ে দ্বিমত করেননি।”
শান্তি ফেরাতে দ্রুত নির্বাচন চায় বিএনপি: স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, “আমরা জোর দিয়ে বলেছি, আজকে বাংলাদেশে নৈরাজ্য চলছে। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটেছে। একটি সুস্পষ্ট নির্বাচনের ঘোষণা দিলে দেশে গণতন্ত্র ও শান্তি ফিরে আসবে।”
উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে নতুন বিতর্ক: বিএনপির এই চাপের পেছনে রয়েছে বর্তমান উপদেষ্টা পরিষদের কিছু সদস্য নিয়ে জনমনে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হওয়া প্রশ্ন। নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং ছাত্র উপদেষ্টাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে কেবল বিএনপি নয়, বিভিন্ন পর্যবেক্ষক মহলও।
বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের কেউ কেউ পূর্ববর্তী রাজনৈতিক আদর্শ ও অবস্থানের কারণে “নিরপেক্ষতা” বজায় রাখতে পারছেন না বলে অভিযোগ এসেছে।
আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজছে উভয়পক্ষ: তবে বৈঠকের সার্বিক পরিবেশ ছিল “গঠনমূলক” বলে মন্তব্য করেছে বিএনপি নেতারা। তারা বলছেন, সরকার পক্ষ আলোচনায় সহযোগিতার মনোভাব দেখিয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বৈঠক হতে পারে একটি বড় সমঝোতার সূচনা। কিন্তু মূল প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—ডিসেম্বরের মধ্যেই কি নির্বাচন সম্ভব? আদৌ কি বিতর্কিত উপদেষ্টারা সরে দাঁড়াবেন?
জামায়াতেরও একই দাবি: এই বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগেই জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও একইরকম দাবি তোলা হয়—নির্বাচনের আগে বিচারকাজ ও সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে। ফলে দেখা যাচ্ছে, সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে বিভিন্ন দিক থেকে।
ড. ইউনূসের ভূমিকা এখন পরীক্ষার মুখে: সবশেষে প্রশ্ন উঠছে, এই অবস্থায় ড. মুহাম্মদ ইউনূস কী পদক্ষেপ নেবেন? বিতর্কিত উপদেষ্টাদের নিয়ে কি তিনি কঠিন সিদ্ধান্ত নেবেন? নির্বাচনের রোডম্যাপ কি নিরপেক্ষভাবে প্রকাশ করবেন?
বিএনপির সঙ্গে এই বৈঠক ছিল তার সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এখন সবার দৃষ্টি ড. ইউনূসের পরবর্তী বক্তব্যের দিকে।
তিনি যদি দ্রুত ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন, তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।






