বীর নারী সখিনা বেগম আমাদের মাঝে আর নেই। মঙ্গলবার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চির বিদায় নিলেন। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। স্যালুট জানাই আমাদের গর্ব, আমাদের সাহসিকতার প্রতীক, বীর মুক্তিযোদ্ধা সখিনা বেগমকে। বীরত্বের এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। যে নারীর রক্তে ছিল সাহস, যার চোখে ছিল প্রতিশোধের আগুন, আর অন্তরে ছিল দেশের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা, তিনি ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী উপজেলার হাওরপাড়ের গুরুই গ্রামের সখিনা বেগম।
মুক্তিযুদ্ধের সময়, একাত্তরের উত্তাল সময়ে, যখন চারদিক ধ্বংস আর শোষণে পুড়ে ছারখার, তখন এই নারীর বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে বীরত্বের তেজ। তাঁর জীবনের গল্প শুধুই এক নারীর নয়, একটি সাহসী জাতিসত্তার প্রতিচ্ছবি।
নিঃসন্তান সখিনা বেগমের স্বামী কিতাব আলী মুক্তিযুদ্ধের আগেই মৃত্যুবরণ করেন। একা নারী, কিন্তু একার মনোবল নয়। দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন পাঁচ রাজাকারকে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে চলা রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে সখিনা ছিলেন এক অদৃশ্য লড়াকু। প্রথমে তিনি বসু বাহিনীর নেতৃত্বে পরিচালিত গুরুই ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের রান্নার দায়িত্ব নেন। কিন্তু রান্নাঘরের চার দেয়ালে বন্দি থাকেননি তিনি। তিনি ছিলেন খবরদাতা, সহযোদ্ধা, কৌশলী সমন্বয়কারী। তিনি ছিলেন এক যুদ্ধংদেহী নারী। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর প্রাণপ্রিয় ভাগনে মতিউর রহমান শহীদ হন সম্মুখযুদ্ধে। এই বেদনা তাঁকে করে তোলে প্রতিশোধপরায়ণ। আর সেই প্রতিশোধই ইতিহাসের পৃষ্ঠায় রক্তাক্ষরে লেখা এক অধ্যায়,যেখানে সখিনা বেগম নিজ হাতে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন পাঁচ রাজাকারকে। আজ সেই দা ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত, যেখানে তাঁর নাম উজ্জ্বল হয়ে জ্বলজ্বল করছে মুক্তিযুদ্ধের আলোকবর্তিকা হয়ে। ধরা পড়া, পালিয়ে আসা এবং জয়, একপর্যায়ে তিনি ধরা পড়েন হানাদার বাহিনীর হাতে। কিন্তু সেখানে থেমে যাননি। জীবন বাজি রেখে কৌশলে পালিয়ে আসেন বন্দিদশা থেকে। সেই সাহস, সেই কৌশল আজকের প্রজন্মের জন্য এক অনন্ত অনুপ্রেরণা। তিনি শুধু লড়াই করেননি, সংগ্রাম করেছেন নারী হয়ে দাঁড়িয়ে পুরুষতান্ত্রিক ভয়াল সমাজের চোখে চোখ রেখে। তিনি ছিলেন আগুনের মতো,শক্তি, সাহস আর সততার প্রতীক। শেষ দিনগুলোতে ছিল নিঃসঙ্গ জীবন, কিন্তু গৌরবময় ইতিহাসের ভাণ্ডার। নিকলীর গুরুই গ্রামে জন্ম নেওয়া এই বীর নারী জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন বাজিতপুর উপজেলার হিলচিয়ার বড়মাইপাড়া এলাকায়। ভাগনি ফাইরুন্নেছা আক্তারের স্নেহভরে দেখাশোনার মধ্যে তিনি বেঁচে ছিলেন স্মৃতি নিয়ে, গর্ব নিয়ে, আর নিজের বুক ভরা একাত্তরের গল্প নিয়ে।
প্রতিদিন সকালে হয়তো তাঁর চোখ খুলতো, কিন্তু মন পড়ে থাকত অতীতের যুদ্ধদিনে, সাহসিকতা আর আত্মত্যাগের মহাকাব্যে।
আমাদের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা, আজ যখন তিনি পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন, আমাদের কেবল একটি দায়িত্ব, তাঁর এই ইতিহাস যেন ভুলে না যাই। এই বীর নারী কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধা নন, তিনি এক জাগ্রত চেতনা, এক প্রেরণার বাতিঘর। আপনি চলে গেলেন, কিন্তু রয়ে গেলেন বাঙালি জাতির রক্তে, গর্বে, ইতিহাসে। আপনার হাতে ধরা দা শুধু একটি অস্ত্র ছিল না, তা ছিল একটি জাতির প্রতিরোধের প্রতীক।আপনার সাহসিকতা প্রমাণ করে, নারী মানেই দুর্বল নয়, নারী মানেই শক্তি, সম্মান ও বিজয়। (তথ্যগুলি সংগৃহীত)।






