ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় মানবদেহের কঙ্কাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত চক্রের এক সদস্যকে আটক করেছে যৌথ বাহিনী। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তি হলেন মো. মাসুদ রানা (২২), যিনি শেরপুরের নকলা উপজেলার বাছুর আলগা গ্রামের বাসিন্দা। তার কাছ থেকে মানুষের মাথার তিনটি খুলি ও ১৫০টি বিভিন্ন ধরনের হাড় উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার (২০ জুন) সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মেহরাবাড়ী এলাকায় চেকপোস্টে এ ঘটনা ঘটে।
ভালুকা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হুমায়ুন কবির জানান, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের একটি চেকপোস্টে তল্লাশি চালানো হচ্ছিল। সে সময় মাসুদ রানা ও আরও একজন ব্যক্তি তিনটি স্কুলব্যাগ হাতে নিয়ে ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তার পাশে অপেক্ষা করছিলেন। তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাগগুলো তল্লাশি করে। তখনই বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য—ব্যাগের ভেতরে রয়েছে মানুষের মাথার খুলি ও বিভিন্ন হাড়গোড়। সঙ্গে থাকা অপর ব্যক্তি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ রানা স্বীকার করেছে যে, কঙ্কালগুলো ঢাকায় বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। এ কাজে তারা বিভিন্ন এলাকার কবরস্থান টার্গেট করে এবং সেখান থেকে রাতের আঁধারে কঙ্কাল সংগ্রহ করে। পরে সেগুলো বিক্রি করা হয় অবৈধ চক্রের কাছে, যারা এগুলো ব্যবহার করে গবেষণা, ফার্মাসিউটিক্যাল কাজ কিংবা কালো জাদুর মতো কার্যকলাপে।
ওসি আরও বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেছি এবং মাসুদ রানাকে আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। পলাতক অপর আসামিকে ধরতে অভিযান চলছে।”
পুরনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি
এই প্রথম নয়, ভালুকায় কঙ্কাল চুরির ঘটনা আগেও ঘটেছে। গত ২১ এপ্রিল রাত ১টার দিকে একই উপজেলার হবিরবাড়ি ইউনিয়নের সোনারবাংলা স্কুলের সামনে চেকপোস্টে তল্লাশির সময় সেনাবাহিনী ও হাইওয়ে পুলিশ তিনজনকে কঙ্কালসহ গ্রেফতার করে। ওই সময় উদ্ধার করা হয় আরও একটি ট্র্যাভেল ব্যাগ, যার ভেতরে ছিল একটি মানুষের মাথার খুলি, একটি মেরুদণ্ডসহ ৭৮টি হাড়।
এরপর ১৬ মে দিবাগত রাতেও হবিরবাড়ি ইউনিয়নের লবনকৌঠা গ্রামে একটি পারিবারিক কবরস্থান থেকে একাধিক কঙ্কাল চুরি হয়। স্থানীয়রা সকালে কবরের মাটি খোঁড়া দেখতে পেয়ে প্রশাসনকে জানালে তদন্তে নেমে জানা যায়, ওই এলাকার মৃত শাহ আলম, ইয়াকুর আলী, তোকমান মোল্লাহ, কাশেম আলী এবং রহমত আলীর কবর খুঁড়ে কঙ্কাল চুরি করা হয়েছিল। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
প্রশাসনের উদ্বেগ ও করণীয়
নিয়মিতভাবে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে চলায় এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পুলিশ বলছে, এই অপরাধের সঙ্গে একটি সংগঠিত চক্র জড়িত, যারা কঙ্কাল সংগ্রহ করে ঢাকার বিভিন্ন চক্রে সরবরাহ করে থাকে। চক্রটির মূল হোতারা এখনও অধরা রয়ে গেছে।
ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে, স্থানীয় কবরস্থানগুলোতে রাতের সময় নজরদারি বাড়ানো হবে এবং প্রয়োজনে সিসিটিভি স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি, কবরস্থান রক্ষা কমিটিগুলোকেও সজাগ থাকতে বলা হয়েছে।
এদিকে, সাধারণ মানুষ এমন ভয়ংকর ও অমানবিক অপরাধের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, মৃত মানুষের প্রতি এমন অশ্রদ্ধা শুধু ধর্মীয় অনুশাসনের লঙ্ঘন নয়, বরং মানবিক বিবেচনায়ও জঘন্য অপরাধ। দ্রুত বিচার আইনের আওতায় এসব চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।






