সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির এক যুগ। ১২ বছর আগে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ধসে পড়েছিল রানা প্লাজা। ভয়াবহ সেই ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করছেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের সদস্য, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও সহকর্মীরা।
বৃহস্পতিবার (২৪ এপ্রিল) সকালে সাভারে অস্থায়ী শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। দিনটিতে ছুটে আসেন নিহতের স্বজন ও আহতরা। এদিকে আজ দিনটি ঘিরে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। এসময় আহত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, গত ১২বছর ধরে কোন ক্ষতিপূরণ দেয়নি সরকার। বিগত সরকার এ নিয়ে সময় ক্ষেপণ করেছে। এই সরকার উদ্যোগ নিয়ে কোন কার্যক্রম করছে না। সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। আহতদের কেউ কোন কাজ করতে পারে না। তাদেরকে কোন পূর্ণবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
১৭ বছরের বিজয় হোসেন, ফুল দিয়ে স্মরণ করেন রানা প্লাজা ধসে নিহত মা শিলিনা বেগম ও বাবা শাহাদাত হোসেন শামীমকে। তিনি নিজে এখন কাজ করেন একটি পোশাক কারখানার হেলপার হিসেবে। তিনি বলেন, তার মাকে তিনদিন পর উদ্ধার করা হয়। কিন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। কিন্ত বাবার লাশ পাওয়া যায়নি। তার দাদীর সাথে ডিএনএ শনাক্ত করে লাশের সন্ধান মেলে জুরাইন কবরস্থানে।
তিনি বলেন, আমাদের যে পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে তা খুবই সামান্য। বর্তমানে পড়ালেখা বাদ দিয়ে গত তিন মাস আগে একটি কারখানায় কাজে যোগ দিয়েছি। আমাদের তো সঠিক ভাবে কেউ চিনে না। অসুস্থ আফরোজা বেগম এসেছেন মেয়ের সাহায্য নিয়ে, তিনি বলেন সকালে জোর করে কাজে যোগ দিয়েছিলেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। সেদিন থেকে আমি অসুস্থ। তাদের বিচার হয়নি আমরাও কোন ক্ষতিপূরণ পাইনি। যা পেয়েছি সব চিকিৎসা আর ওষুধ কিনতে চলে যায়। এখন সেই অসুস্থ থেকেই বড় বড় রোগ ধরা পরেছে। এখন এগুলো চিকিৎসা কিভাবে করাবো। আমাদের কাছে তো কোন টাকা পয়সা নাই । গরিব মানুষ, বড়লোক হলে তো আর কাজ করতে আসতাম না। এখন সেই টাকা নিয়ে এত ঘুরাচ্ছে। আমাদের একদম পথে বসিয়ে দিয়েছে। এখন ছেলে মেয়ে নিয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে। আমাদের দাবি আমাদের পূর্ণবাসন করতে হবে। আমাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, ক্ষতিপূরণের আইন সংশোধন করে রানা প্লাজা, তাজরীনসহ সব আহত ও নিহত শ্রমিকদের একজীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। শ্রমিক হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসে ১ হাজার ১৩৮ শ্রমিক মারা গেছেন। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। কিন্তু এক যুগেও এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার কাজ শেষ হয়নি, যা খুবই দুঃখজনক।’
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার ওয়ার্কার্স ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের পর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি রানা প্লাজা ফান্ডে প্রচুর অর্থ দিয়েছে। অথচ নিহত শ্রমিকদের পরিবারসহ আহত শ্রমিকেরা গত এক যুগেও কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি। আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়নি।’
খায়রুল মামুন মিন্টু আরও বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় ভবনমালিক এক যুগ ধরে জেলে আছেন, বিচারকাজ শেষ হয়নি। কিন্তু কারখানার মালিকেরা দিব্যি বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’ আজ সকাল থেকে রাষ্ট্র সংস্কার শ্রমিক আন্দোলন, গার্মেন্টস টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন ও গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন রানা প্লাজার সামনে নির্মিত অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ধসে পড়ে রানা প্লাজা। এতে ১ হাজার ১৩৫ জন নিহত হন। গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন আরও ১ হাজার ১৬৯ জন। পরে এ ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে অবহেলাজনিত মৃত্যু চিহ্নিত হত্যা মামলাটি করে পুলিশ। ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের অভিযোগে অপর মামলাটি করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ভবন নির্মাণসংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে আরেকটি মামলা করে।






