জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির আদেশ উপেক্ষার অভিযোগ

প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা ফিরে পেতে সৈয়দ মাহবুব-ই-জামিলের আর কতদিন অপেক্ষা?

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ :

ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতির স্পষ্ট নির্দেশের পরও একজন প্রাজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তার সম্মান ও চাকরির অধিকার ফিরিয়ে দিতে গড়িমসি করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ফলে প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়ে বছরের পর বছর এক অন্তহীন অপেক্ষার প্রহর গুনছেন প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুব-ই-জামিল।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে হয়রানির শিকার হন এই কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত লঘুদণ্ড রাষ্ট্রপতি নিজে মওকুফ করলেও, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখন সেই একই অভিযোগকে সামনে এনে তার চাকরির ধারাবাহিকতা ও পদোন্নতির পথ আটকে রেখেছে। অথচ সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আদেশই চূড়ান্ত, সেটি অমান্য করা মানে শুধু প্রশাসনিক নিয়ম ভঙ্গ করা নয়—এটি একজন মানুষের জীবনের সঙ্গে অন্যায় আচরণ।

সৈয়দ মাহবুব-ই-জামিল তার আবেদনপত্রে লিখেছেন, ২০০২ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ব্রাজিলের বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রথম সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঐ সময় সরকারের পরিবর্তন হলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন তিনি । তাঁর পোস্টিং বাতিল করে তাকে দেশে ফেরার নির্দেশ দেয় সরকার । অথচ দেশে ফেরার আগেই তার পাসপোর্ট সরকারের নির্দেশে জব্দ করা হয়, ফলে তার পক্ষে তখন দেশে ফেরা সম্ভব হয়নি। তিনি কোনো অবৈধ উদ্দেশ্যে অনুপস্থিত ছিলেন না; বরং নিজ দেশের জালে আটকে পড়া এক প্রবাসী রাষ্ট্রকর্মীর মতো তিনি নিরুপায় ছিলেন।

২০০৭ সালের ১৮ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশে ফিরে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। অথচ এরপরও তার বিরুদ্ধে “বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকার” অভিযোগ তুলে বিভাগীয় মামলা চালানো হয় এবং ২০০৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর তাকে লঘুদণ্ড প্রদান করা হয়—যার ফলে তার দুই বছরের ইনক্রিমেন্ট স্থগিত হয় এবং ওই সময়কাল চাকরির ইতিহাস থেকে বাদ পড়ে।

পরে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানালে তিনি বিষয়টির মানবিক ও বাস্তব দিক বিবেচনা করে দণ্ড মওকুফ করেন। এমনকি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিজেও ১ এপ্রিল তার লঘুদণ্ড প্রত্যাহার করে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু চরম বিস্ময়ের সাথে দেখা যায়, একই মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন-৪ অধিশাখা ২৪ জুন চিঠি দিয়ে জানায়, ওই সময়কালকে কর্মকাল হিসেবে গণ্য করা যাবে না, এবং চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করারও সুযোগ নেই।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাষ্ট্রপতি যখন দণ্ড মওকুফ করেছেন, তখন ওই বিষয়ে পুনরায় প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। বরং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যে ব্যাখ্যায় চাকরির ধারাবাহিকতা অস্বীকার করছে তা আইনি এবং নৈতিক উভয় দিক থেকেই রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের বিরোধী।

এই কর্মকর্তারা আরও বলেন, মাহবুব জামিল যখন দেশে ফিরে এসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন এবং তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন থেকেই কার্যত তার চাকরির ধারাবাহিকতা স্বীকৃতি পেয়েছে। এখন যদি সেই ধারাবাহিকতা অস্বীকার করা হয়, তাহলে সেটি হবে এক ধরনের প্রশাসনিক প্রতিশোধ, যা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

মাহবুব জামিলের মতো একজন অভিজ্ঞ এবং রাজনৈতিকভাবে নির্যাতিত কর্মকর্তার এ ধরনের হয়রানি শুধু একটি ব্যক্তিকে নয়, পুরো প্রশাসনব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী আদেশ যেখানে উপেক্ষিত হয়, সেখানে ন্যায়বিচার কেবলই কাগজে-কলমে থেকে যায়।

যদিও বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এই অবিচার দূর হবে—এটাই ছিল সৈয়দ জামিলের একমাত্র প্রত্যাশা।
কারণ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসেই বিগত সময়ে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের প্রাপ্য পেতে আবেদন করতে আহ্বান জানিয়েছিল। সেই নির্দেশ অনুসারে মাহবুব জামিল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নির্ধারিত ছকে আবেদনও করেন। কিন্তু যাদের আবেদন বিবেচনায় নিয়ে পদোন্নতি, সুযোগ-সুবিধা কিংবা মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হয়, সেই ‘ভাগ্যবানদের’ তালিকায় তার নাম স্থান পায়নি।
কি কারণে বা কোন যোগ্যতার অভাবে তার আবেদন বিবেচিত হয়নি—তা জানতে পারেননি তিনি, বা তার মতো অন্যরাও।

জনপ্রিয় সংবাদগুলো

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির আদেশ উপেক্ষার অভিযোগ

প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা ফিরে পেতে সৈয়দ মাহবুব-ই-জামিলের আর কতদিন অপেক্ষা?

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশ :

সংগৃহীত

রাষ্ট্রপতির স্পষ্ট নির্দেশের পরও একজন প্রাজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তার সম্মান ও চাকরির অধিকার ফিরিয়ে দিতে গড়িমসি করছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ফলে প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হয়ে বছরের পর বছর এক অন্তহীন অপেক্ষার প্রহর গুনছেন প্রশাসন ক্যাডারের ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুব-ই-জামিল।

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে হয়রানির শিকার হন এই কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত লঘুদণ্ড রাষ্ট্রপতি নিজে মওকুফ করলেও, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এখন সেই একই অভিযোগকে সামনে এনে তার চাকরির ধারাবাহিকতা ও পদোন্নতির পথ আটকে রেখেছে। অথচ সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আদেশই চূড়ান্ত, সেটি অমান্য করা মানে শুধু প্রশাসনিক নিয়ম ভঙ্গ করা নয়—এটি একজন মানুষের জীবনের সঙ্গে অন্যায় আচরণ।

সৈয়দ মাহবুব-ই-জামিল তার আবেদনপত্রে লিখেছেন, ২০০২ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ব্রাজিলের বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রথম সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঐ সময় সরকারের পরিবর্তন হলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন তিনি । তাঁর পোস্টিং বাতিল করে তাকে দেশে ফেরার নির্দেশ দেয় সরকার । অথচ দেশে ফেরার আগেই তার পাসপোর্ট সরকারের নির্দেশে জব্দ করা হয়, ফলে তার পক্ষে তখন দেশে ফেরা সম্ভব হয়নি। তিনি কোনো অবৈধ উদ্দেশ্যে অনুপস্থিত ছিলেন না; বরং নিজ দেশের জালে আটকে পড়া এক প্রবাসী রাষ্ট্রকর্মীর মতো তিনি নিরুপায় ছিলেন।

২০০৭ সালের ১৮ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশে ফিরে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন। অথচ এরপরও তার বিরুদ্ধে “বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিত থাকার” অভিযোগ তুলে বিভাগীয় মামলা চালানো হয় এবং ২০০৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর তাকে লঘুদণ্ড প্রদান করা হয়—যার ফলে তার দুই বছরের ইনক্রিমেন্ট স্থগিত হয় এবং ওই সময়কাল চাকরির ইতিহাস থেকে বাদ পড়ে।

পরে রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানালে তিনি বিষয়টির মানবিক ও বাস্তব দিক বিবেচনা করে দণ্ড মওকুফ করেন। এমনকি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নিজেও ১ এপ্রিল তার লঘুদণ্ড প্রত্যাহার করে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে। কিন্তু চরম বিস্ময়ের সাথে দেখা যায়, একই মন্ত্রণালয়ের মাঠ প্রশাসন-৪ অধিশাখা ২৪ জুন চিঠি দিয়ে জানায়, ওই সময়কালকে কর্মকাল হিসেবে গণ্য করা যাবে না, এবং চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করারও সুযোগ নেই।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাষ্ট্রপতি যখন দণ্ড মওকুফ করেছেন, তখন ওই বিষয়ে পুনরায় প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। বরং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যে ব্যাখ্যায় চাকরির ধারাবাহিকতা অস্বীকার করছে তা আইনি এবং নৈতিক উভয় দিক থেকেই রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তের বিরোধী।

এই কর্মকর্তারা আরও বলেন, মাহবুব জামিল যখন দেশে ফিরে এসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন এবং তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন থেকেই কার্যত তার চাকরির ধারাবাহিকতা স্বীকৃতি পেয়েছে। এখন যদি সেই ধারাবাহিকতা অস্বীকার করা হয়, তাহলে সেটি হবে এক ধরনের প্রশাসনিক প্রতিশোধ, যা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

মাহবুব জামিলের মতো একজন অভিজ্ঞ এবং রাজনৈতিকভাবে নির্যাতিত কর্মকর্তার এ ধরনের হয়রানি শুধু একটি ব্যক্তিকে নয়, পুরো প্রশাসনব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী আদেশ যেখানে উপেক্ষিত হয়, সেখানে ন্যায়বিচার কেবলই কাগজে-কলমে থেকে যায়।

যদিও বর্তমান অন্তবর্তী সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এই অবিচার দূর হবে—এটাই ছিল সৈয়দ জামিলের একমাত্র প্রত্যাশা।
কারণ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসেই বিগত সময়ে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের প্রাপ্য পেতে আবেদন করতে আহ্বান জানিয়েছিল। সেই নির্দেশ অনুসারে মাহবুব জামিল ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নির্ধারিত ছকে আবেদনও করেন। কিন্তু যাদের আবেদন বিবেচনায় নিয়ে পদোন্নতি, সুযোগ-সুবিধা কিংবা মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হয়, সেই ‘ভাগ্যবানদের’ তালিকায় তার নাম স্থান পায়নি।
কি কারণে বা কোন যোগ্যতার অভাবে তার আবেদন বিবেচিত হয়নি—তা জানতে পারেননি তিনি, বা তার মতো অন্যরাও।