দিনভর টানা বৃষ্টিতে ঢাকার প্রধান সড়কগুলো রূপ নিয়েছে একেকটি জলাশয়ে। জলাবদ্ধতার সঙ্গে চিরচেনা যানজটের জোড়া আঘাতে পুরো রাজধানীর জনজীবন হয়ে পড়েছে অচল। অফিস টাইমে শুরু হওয়া দুর্ভোগ রাত গভীর হলেও কমেনি, বরং বেড়েছে নাগরিক ক্ষোভ ও হতাশা।
বৃহস্পতিবার (২৯ মে) দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিউ মার্কেট, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, ধূপখোলা, গেন্ডারিয়া প্রভৃতি এলাকায় সড়কে পানি জমে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বড় গর্ত, খানা-খন্দে পানি জমে দুর্ভোগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ফেসবুকে গোলাম কিবরিয়া নামের এক ব্যক্তি লেখেন, “বিকেল ৫:৩০-এ মতিঝিল থেকে বসুন্ধরার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছি। সন্ধ্যা ৭:১০-এ এসে পৌঁছেছি মাত্র পল্টন থানার সামনে। মাত্র ২ কিলোমিটার আসতেই লেগেছে দেড় ঘণ্টার বেশি। এরপর পল্টন থানার সামনের মাত্র ২০০ গজ পার হতে সময় লেগেছে আরও ৫০ মিনিট।” তিনি লিখেছেন, “এই দেশে জন্মানো পাপ, আর ঢাকায় থাকা মহাপাপ।”
একই ধরনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন আবুল খায়ের নামের আরেক ভুক্তভোগী। তিনি লিখেছেন, “অফিস থেকে বের হয়েছি ৫টায়। এখন রাত ১০:৩০, আমি এখনও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে বসে আছি। পুরো সড়কজুড়ে গাড়ির স্রোত দাঁড়িয়ে আছে। এক-দুই গজ করে গড়াচ্ছে গাড়ি, কে জানে কখন বাসায় পৌঁছাতে পারবো।”
একইভাবে বনশ্রী থেকে রাত সাড়ে ৮টায় বের হয়ে রাত ১০টা ৪২ মিনিটেও কুড়িল ফ্লাইওভারে আটকে থাকার কথা জানিয়েছেন সিরাজুল ইসলাম সুমন।
বৃষ্টিতে চড়েছে যাতায়াত খরচ: বৃষ্টি নামলেই ঢাকায় অস্বাভাবিক হারে বাড়ে সিএনজি, রিকশা এবং অ্যাপভিত্তিক যানের ভাড়া। যাত্রীদের অভিযোগ, চালকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করে। রাস্তায় হাঁটুসমান পানি থাকায় বিকল্প না থাকায় যাত্রীদের এসব ভাড়া মেনে নিতে হয়।
পুরান ঢাকার কলতাবাজার এলাকার বাসিন্দা সুজাতা বেগম ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, “বৃষ্টিতে রিকশাওয়ালারা নবাব হয়ে যায়। ৫০ টাকার ভাড়া চায় ২০০ টাকা। বাধ্য হয়ে যেতে হয়, কারণ রাস্তায় পানি আর হাঁটার উপায় নেই।”
শান্তিনগরের একটি করপোরেট অফিসে চাকরি করেন মোক্তার হোসেন। তিনি জানান, “সাধারণত ১০ টাকার বাস ভাড়া দিয়ে সদরঘাট থেকে অফিসে যাই। কিন্তু বৃষ্টির দিনে হেলপার আগেই বলে দেয়, আজ ২০ টাকা লাগবে, না হলে উঠতে দেবে না।”
আজহার আলী নামের একজন ব্যাংক কর্মকর্তা জানান, “পল্টন থেকে উত্তরা আসতে সাধারণত সিএনজি ভাড়া লাগে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। বৃষ্টির দিনে সেটা হয় ৬০০ টাকা। অনেক সময় এতেও চালক রাজি হন না।”
দায় নিতে নারাজ সিটি করপোরেশন: বছরের পর বছর বর্ষা এলেই রাজধানীবাসী জলাবদ্ধতার ভোগান্তিতে পড়ে। অথচ দুই সিটি করপোরেশন এই সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ। নগরবাসী অসহায়, কিন্তু কর্তৃপক্ষ সমস্যার দায় নিতে প্রস্তুত নয়।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, “বৃষ্টির পানি রাস্তার ওপর জমেছে, বৃষ্টি কমলেই আধা ঘণ্টার মধ্যে জলাবদ্ধতা চলে যাবে। কোথাও স্থায়ী জলাবদ্ধতা হলে আমাদের কুইক টিম কাজ করবে।”
তিনি জানান, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে বিশেষ চারটি দল গঠন করা হয়েছে, যারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা দূরীকরণেও কাজ করবে। নিউ মার্কেট এলাকার জলাবদ্ধতা সম্পর্কে তিনি বলেন, “ওই জায়গা নিচু হওয়ায় এমন হয়। আমাদের বড় প্রকল্প রয়েছে, যা বাস্তবায়ন হয়নি। আগামী বর্ষার আগেই কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) হটলাইন (১৬১০৬) এবং কন্ট্রোল রুমের মোবাইল (০১৭৩৩৯৮২৪৮৬) নম্বরে জলাবদ্ধতার খবর জানাতে অনুরোধ করেছে।
সড়কে ভিজে দায়িত্ব পালনে ট্রাফিক পুলিশ: ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ফেসবুক পেজে জানানো হয়, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা বৃষ্টিতে ভিজে নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবু সাধারণ মানুষের ভোগান্তির যেন শেষ নেই। প্রতি বর্ষা মৌসুমেই নতুন করে দেখা দেয় পুরনো সমস্যা—জলাবদ্ধতা ও যানজট। অথচ স্থায়ী সমাধান নেই কোথাও। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেবল আশ্বাসের বন্যা বইয়ে যাচ্ছে, বাস্তবতায় তার প্রতিফলন সামান্যই।






