সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছে বিএনপি। দলটি বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে স্পষ্ট করে জানায়—শুধুমাত্র একটি নির্বাচিত জাতীয় সংসদই সংবিধান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
সংসদ ভবনের এলডি হলে সকাল ১১টা থেকে বিকেল পৌনে ৫টা পর্যন্ত চলে বৈঠকটি। বিএনপির পক্ষে নেতৃত্ব দেন স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। অন্য চার সদস্যও প্রতিনিধি দলে ছিলেন। কমিশনের পক্ষ থেকে ছিলেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ, ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিচারপতি এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং মনির হায়দার।
বিএনপি জানায়, সংবিধান সংশোধন নিয়ে আলোচনা চলতে পারে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেবল নির্বাচিত সংসদই নেবে—এই অবস্থান থেকে একচুলও সরবে না তারা।
আলোচনায় প্রস্তাবনা, প্রজাতন্ত্র, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি, মৌলিক অধিকার ও আইন বিভাগের বিষয়গুলো উঠে আসে। কিছু বিষয়ে ঐকমত্য হলেও, অনেক ক্ষেত্রেই মতভেদ রয়ে গেছে।
৭০ অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে বিএনপির প্রস্তাব—সরকার পরিচালনায় স্থিতিশীলতা রক্ষায় এই অনুচ্ছেদ পুরোপুরি উন্মুক্ত করা যাবে না। তবে অর্থ বিল, সংবিধান সংশোধন, আস্থা ভোট ও জাতীয় নিরাপত্তার বাইরে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশ ও ভোটাধিকার থাকা উচিত।
গণভোট বিষয়ে বিএনপি বলেছে, সব ধরনের সংশোধনীতে গণভোট বাধ্যতামূলক করা যৌক্তিক নয়। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অনুচ্ছেদে গণভোট হতে পারে, তবে প্রতিটি ক্ষেত্রে নয়।
জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (NCC) গঠনের প্রস্তাবেও আপত্তি জানিয়েছে বিএনপি। তারা মনে করে, এটি কার্যকর হলে নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা দুর্বল হয়ে পড়বে।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদ নিয়ে বিএনপি স্পষ্ট জানায়—তারা এই দুই নীতির পক্ষে নয়। বরং ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ‘আল্লাহর ওপর আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র’—এই মূলনীতিগুলোর পক্ষেই দলটি রয়েছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়েও মত দিয়েছে বিএনপি। তারা বলেছে, সংবিধানের ৯৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন ছাড়া নতুন কিছু করা হলে তা অসাংবিধানিক হবে।
কমিশনের রিপোর্টে দলটির মত ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে বিএনপি। তাদের দাবি, ‘হ্যাঁ/না’ উত্তরের কাঠামো বিভ্রান্তিকর হয়েছে।
বিএনপি জানিয়েছে, রিপোর্টে উল্লিখিত ১৩১টি প্রস্তাবের মধ্যে ২৫টিতে তারা একমত, আরও ২৫টির সঙ্গে আংশিক একমত এবং বাকিগুলো নিয়ে দ্বিমত রয়েছে।
সংলাপে নজরুল ইসলাম খান বলেন, “সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে তা দীর্ঘায়িত হলে জনগণের প্রত্যাশা হারিয়ে যেতে পারে।”
কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ বলেন, “বাংলাদেশের গণতন্ত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার লক্ষ্যে এ আলোচনা হচ্ছে।”
আগামী ২১ এপ্রিল আবার বসবে বিএনপি ও কমিশনের পরবর্তী বৈঠক।
বিএনপি বলছে, সংবিধান নিয়ে এই সংলাপ তারা ইতিবাচকভাবেই দেখছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমেই নিতে হবে—এটাই তাদের অনড় অবস্থান।






