এক যুগেরও বেশি সময় ধরে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল হিসেবে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নতুন করে রাজনৈতিক মঞ্চে ফিরে আসবে কি না—এই প্রশ্নের জবাব মিলতে যাচ্ছে রোববার, ১ জুন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ওই দিন ঘোষণা করতে যাচ্ছে বহুল আলোচিত মামলার চূড়ান্ত রায়। আদালতের রায়ের উপর নির্ভর করছে—জামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে কি না, তাদের দল হিসেবে বৈধতা ফিরবে কি না, এবং সর্বোপরি—বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন করে এক পুরোনো নামের প্রত্যাবর্তন হবে কি না।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ শুক্রবার এজলাস তালিকায় মামলাটিকে এক নম্বরে রেখেছে, যা রায়ের তাৎপর্যকেই স্পষ্ট করে। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির বেঞ্চ ওই দিন রায় ঘোষণা করবেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, মানবতাবিরোধী অপরাধে দলটির শীর্ষ নেতাদের একের পর এক মৃত্যুদণ্ড এবং যুদ্ধাপরাধের দায়ে ব্যাপক সামাজিক ঘৃণার শিকার জামায়াতে ইসলামী ২০০৮ সালেও ছিল জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বৈধ রাজনৈতিক দল। কিন্তু ২০১৩ সালের ১ আগস্ট, হাইকোর্ট তাদের নিবন্ধন বাতিল করে রায় দেয়—যেখানে বলা হয়, জামায়াতের গঠনতন্ত্র সংবিধানবিরোধী।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে নির্বাচন কমিশন ওই হাইকোর্টের রায়ের ভিত্তিতে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। ফলাফলস্বরূপ দলটি ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি। তবে দলটি ২০ দলীয় জোটের ব্যানারে জামিন নিয়ে কিছু প্রার্থী দেয়।
আবার ভোটের মাঠে নামার চেষ্টা: বিচারিক প্রক্রিয়ায় দলটি হাল ছাড়েনি। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে তারা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালিয়ে আসছে। সর্বশেষ ১৪ মে আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চে শুনানি শেষ হয়। এখন রায় ঘোষণার অপেক্ষা।
জামায়াতের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার এহসান এ. সিদ্দিক, শিশির মনির ও ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন। আদালতে উপস্থিত ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকসহ গুরুত্বপূর্ণ আইনজীবী ও সমর্থকরা। ১৪ মে শুনানি শেষ হবার পরপরই আদালত রায়ের দিন ধার্য করে দেয় ১ জুন, রোববার।
রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ?: এই রায়ের মাধ্যমে যদি জামায়াত নিবন্ধন ফিরে পায়, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ সৃষ্টি হতে পারে। প্রথমত, একটি দীর্ঘদিনের বিতর্কিত দল ফের সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি পাবে। দ্বিতীয়ত, একে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে নতুন জোট, যার প্রভাব ভবিষ্যতের জাতীয় নির্বাচনেও পড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য ঘেঁষা কূটনৈতিক চাপ, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং বর্তমান সরকারের ‘সহযোগী শাসন’ নীতির অংশ হিসেবে জামায়াতের প্রত্যাবর্তন অনেকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে। তবে অপর পক্ষ বলছে, এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর চরম আঘাত হবে।
সমর্থকরা জামায়াতের নিবন্ধন ফিরে পাওয়াকে তাদের রাজনৈতিক অধিকার হিসেবে দেখলেও, বিরোধীরা এটিকে ‘যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন’ বলে আখ্যা দিচ্ছে। জামায়াত নেতাদের ফাঁসির বিরুদ্ধে যেসব মানবাধিকার সংগঠন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিবৃতি দিয়েছিল, তারাই আজ রায় নিয়ে আবারও সক্রিয় হতে পারে।
একটি প্রশ্ন বারবার উঠছে—একটি দল, যার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার সময় গণহত্যার সহযোগিতা, পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া, এবং নারী নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, তারা কি আবার সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাওয়ার অধিকার রাখে?
রোববার শুধু জামায়াতের রায় নয়—একই দিনে রয়েছে আলোচিত মেজর সিনহা হত্যা মামলার হাইকোর্টের রায় এবং সাবেক এমপি মমতাজ বেগমের আরও একটি রিমান্ড শুনানি। তিনটি ঘটনার সম্মিলিত অভিঘাত বাংলাদেশের রাজনৈতিক, বিচারিক ও সামাজিক অঙ্গনে এক প্রবল আলোড়নের জন্ম দিতে পারে।
রোববারের রায় কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ফিরে পাওয়ার প্রশ্ন নয়—এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, মূল্যবোধ, বিচারবোধ ও ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণের মুহূর্ত। জামায়াত কি ফিরে আসছে, নাকি চূড়ান্তভাবে পথরুদ্ধ হচ্ছে—এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গোটা জাতি তাকিয়ে থাকবে আপিল বিভাগের দিকে।






