চলমান বিদেশি বিনিয়োগ খরায় চাপের মুখে থাকা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অবশেষে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। শনিবার (৩১ মে) ঢাকায় পৌঁছেছেন চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাও, সঙ্গে রয়েছে প্রায় ১০০ জন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীর বিশাল প্রতিনিধি দল। এমন উচ্চপর্যায়ের সফর বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন, এবং সরকার এতে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রত্যাশা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এ সফর একদিকে যেমন ঢিলেঢালা বিনিয়োগ প্রবাহে প্রাণ সঞ্চার করতে পারে, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। কেননা, চীনা বিনিয়োগে উৎসাহিত হলেও বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে।
চীনা প্রতিনিধি দল আজই বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনের সঙ্গে বৈঠক করবে। রোববার পাঁচটি ভিন্ন সেশনে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ‘ম্যাচমেকিং’ বৈঠক হবে, যেখানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
সোমবার অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ-চীন যৌথ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য কমিশনের বৈঠক। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এতে নেতৃত্ব দেবেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, আর চীনের পক্ষে নেতৃত্বে থাকবেন ওয়াং ওয়েনতাও। একই দিনে চীনা ব্যবসায়ীরা গাজীপুরের একটি গার্মেন্টস কারখানাও পরিদর্শন করবেন।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) জানিয়েছে, সফরের সময় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহজীকরণে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে। চীন এরইমধ্যে এ বিষয়ে খসড়া পাঠিয়েছে। এছাড়া চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য কল সেন্টার ও হটলাইন চালুরও প্রস্তাব দিয়েছে প্রধান উপদেষ্টা।
প্রেস উইংয়ের বরাতে জানা গেছে, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার গত ৯ মাসে বিদেশি বিনিয়োগের পথ সুগম করতে নীতিগত ও প্রশাসনিক সংস্কারে কাজ করেছে। এখন মাসিক ভিত্তিতে কোরিয়ান ও চীনা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রাতরাশ সভা আয়োজন করবে বিডা, যাতে প্রধান উপদেষ্টা নিজেও অংশ নিতে পারেন।
এদিকে চীনের একাধিক কোম্পানি বৈদ্যুতিক যান, লিথিয়াম ব্যাটারি, বায়ু বিদ্যুৎ এবং সোলার প্ল্যান্টে আগ্রহ দেখিয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলায় চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলেও তারা বিনিয়োগে প্রস্তুত। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে কিছু কোম্পানি ইতোমধ্যে উদ্যোগী হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো, বিদেশি বিনিয়োগের বর্তমান চিত্র উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে নিট বৈদেশিক বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৮৬ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম। গ্যাস সংকট, উচ্চ খরচ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এই পতনের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির।
তিনি বলেন, “গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি এবং বিনিয়োগের ব্যয় এত বেশি যে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এসব সমাধান না হলে চীনের বিনিয়োগও সীমিত থাকবে।”
তবে তার মতে, “চীন যদি অল্প সময়ের মধ্যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে, তাহলে এটি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এক বড় সাফল্য হবে।” তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, “চীনের বিনিয়োগ বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপড়েন তৈরি হতে পারে, যা অর্থনৈতিক কূটনীতিতে জটিলতা তৈরি করবে।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৩৭ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়েছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন আপাতত শুল্ক কার্যকর করেনি, তবে ভবিষ্যতে তা কার্যকর হলে বিপাকে পড়তে পারে রপ্তানিকারকরা। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, তেল ও গ্যাস কেনার প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা সহজ হয়।
এছাড়া ভারতও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশকে বাণিজ্যিকভাবে চাপে ফেলেছে। এপ্রিল থেকে ভারত স্থলপথে বাংলাদেশের গার্মেন্টস আমদানি বন্ধ করেছে। এর আগে সুতা আমদানিও নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ, আর ভারত তৃতীয় দেশে পণ্য পাঠানোর জন্য তাদের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ প্রত্যাহার করেছে।
সর্বোপরি, চীনের এ সফর যদি কার্যকর বিনিয়োগে রূপ নেয়, তবে তা একদিকে যেমন অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে, তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের জন্যও বড় একটি স্বস্তির বাতাস বয়ে আনবে। তবে তা নির্ভর করছে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নের ওপর। আর বাস্তবায়নের পথে বাধা হতে পারে জ্বালানি সংকট ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ।






