রোহিঙ্গা সংকট যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে এটি শুধুমাত্র একটি মানবিক সংকটই নয়—বরং দ্রুতই তা হয়ে উঠতে পারে গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য এক গুরুতর হুমকি। এমন সতর্ক বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন।
নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর দারিদ্র্য, উন্নয়ন ঘাটতি ও সংঘাতের প্রভাব’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এই আলোচনায় অংশ নিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা রোহিঙ্গা সংকটের বহুমাত্রিক প্রভাব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “গত আট বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ মানবিক কারণে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে এসেছে। কিন্তু এই সংকটের স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় এটি এখন মানবিক সীমানা ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং নিরাপত্তাজনিত সংকটে পরিণত হয়েছে।”
সংকটের রাজনৈতিক ও মানবিক প্রেক্ষাপট: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমনপীড়নের শিকার হয়ে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট দলে এই জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে ঢুকেছে। বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে প্রায় ১২ লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে।
এই শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও পরিবেশে পড়েছে বিরাট চাপ। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় মাদক, অস্ত্র, মানবপাচারসহ নানা অপরাধমূলক কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়ছে।
এই বাস্তবতায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের মতো একটি ফোরামে বাংলাদেশ এ সংকটের টেকসই সমাধানে কার্যকর আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানায়।
দ্রুত প্রত্যাবাসনের আহ্বান: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তার বক্তব্যে বলেন, “মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর যে সহিংসতা ও নির্যাতন চলছে, তার ফলে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এই জনগোষ্ঠীকে তাদের নিজ ভূমিতে পূর্ণ নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদার সঙ্গে প্রত্যাবাসনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।”
তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান—রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় যেন এখনই কার্যকর ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
তরুণদের প্রসঙ্গ ও উগ্রবাদের আশঙ্কা: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তার বক্তব্যে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক আন্দোলনসমূহে তরুণদের অংশগ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসে তারুণ্য বারবার পরিবর্তনের অগ্রভাগে ছিল— হোক তা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক ‘জুলাই বিপ্লব’। তারা অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃপ্ত প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে।”
তবে একইসঙ্গে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, যদি তরুণরা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের উপযুক্ত সুযোগ না পায়, তবে তারা চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে যেতে পারে। দারিদ্র্য, বৈষম্য ও উন্নয়ন ঘাটতির মতো বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করতে পারে এবং সহিংসতা জন্ম দিতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইউনূসের ‘তিন শূন্য’ দর্শন: বিশ্বব্যাপী বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে তিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রস্তাবিত ‘তিনটি শূন্য নীতি’র কথা তুলে ধরেন—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “একটি শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ নির্মাণে এই তিনটি লক্ষ্য অর্জন অত্যন্ত জরুরি। আর এজন্য উন্নয়ন ও শান্তি প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।”
তিনি জোর দিয়ে বলেন, একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই পৃথিবী গঠনে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি অটুট রয়েছে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে আগ্রহী।
বৈঠকে উপস্থিত অন্যান্য দেশ: নিরাপত্তা পরিষদের এ বৈঠকে বাংলাদেশ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সুইডেন, উরুগুয়ে ও পূর্ব তিমুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জার্মানির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা। তাঁরা নিজেদের বক্তব্যে সংঘাত ও দারিদ্র্যের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বৈষম্য দূরীকরণের কৌশল নিয়ে আলোকপাত করেন।
আন্তর্জাতিক সহানুভূতির প্রয়োজন: বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দীর্ঘদিন আলোচনার বিষয় হলেও কার্যকর সমাধানের জন্য এখনো কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বাংলাদেশ এককভাবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপ বহন করে চলেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এক্ষেত্রে জাতিসংঘ এবং আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। শুধু মানবিক সাহায্য নয়, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মহলের উচিত মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করা।
রোহিঙ্গা সংকট যে এখন আর কেবল একটি শরণার্থী সমস্যা নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকির ইঙ্গিত দিচ্ছে—তা বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে জাতিসংঘের ফোরামে তুলে ধরেছে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবিলম্বে জবাবদিহিমূলক, মানবিক ও টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।






