বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন এক অদ্ভুত ধাঁধার সময়। নির্বাচন কবে হবে, কোনো নিশ্চয়তা নেই। সরকারও রোডম্যাপ দেয়নি। আন্দোলনের মাঠে নেই উল্লেখযোগ্য গণজোয়ার। তবুও যেন এক আশ্চর্য তৎপরতা—ছোট ছোট দলগুলোকে নিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে রাজনৈতিক বলয়, সাজানো হচ্ছে সম্ভাব্য জোটের ছক।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক মহলে এখন তিনটি স্পষ্ট বলয় দৃশ্যমান: একদিকে বিএনপি, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামি, এবং তৃতীয়ত একটি নতুন বলয় গঠনের উদ্যোগ, যার পেছনে আছেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
ড. ইউনূস রাজনীতিতে সক্রিয় কোনো পদক্ষেপ না নিলেও, ‘জনতার সরকার’ নামের একটি ব্যানারের চারপাশে কিছু ছোট দল একত্রিত হচ্ছে। এর মধ্যে আছে বিএনপির নিবন্ধিত শরিক, দুটি বিভক্ত ইসলামী দল এবং গণসংহতি আন্দোলনের একটি অংশ। যদিও ইউনূস নিজে বলেননি তিনি রাজনৈতিক জোট গঠন করছেন, তবুও তার নাম ঘিরে সম্ভাব্য ‘তৃতীয় বলয়’-এর গুঞ্জন জোরালো হচ্ছে।
তবে এই মুহূর্তে বিএনপির মূল নজর একটি বৃহৎ বিরোধী ঐক্য গড়ে তোলার দিকে, যার কৌশল হচ্ছে ছোট দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ। সিপিবি-বাসদের সঙ্গে বৈঠক তারই অংশ। যদিও এরা যুগপৎ আন্দোলনে আগে সাড়া দেয়নি, এখন ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াত ইসলামি পুরোপুরি নির্বাচনী জোট গঠনের কৌশল নিয়েছে। তারা চায় আসন ভাগাভাগি নিশ্চিত করে ইসলামী দলগুলোর একক প্রার্থী মাঠে নামাতে। তবে তারা এখনই প্রকাশ্যে আসতে চায় না, বরং নির্বাচন ঘনালেই চূড়ান্ত রূপরেখা দিতে চায়।
এদিকে এনসিপিও নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা আওয়ামী লীগের বিচারের দাবি, সংস্কার এবং গণপরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসছে। যদিও তারা সরাসরি কোনো জোটের কথা বলছে না, তবুও বৈঠকের ধরন দেখে অনুমান করা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে তারা একটি নতুন বলয় গঠনের দিকে অগ্রসর হতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই তিন বলয়ের তৎপরতা যতই সক্রিয় হোক, এগুলো এখনো জনসম্পৃক্ত কোনো আন্দোলন বা ময়দানি রাজনীতিতে রূপ পায়নি। বরং মনে হচ্ছে, সম্ভাব্য নির্বাচনের আগেই কে কোথায় থাকবে, কোন বলয়ে থাকলে ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভাগ বেশি জুটবে—এই হিসাবই এখন বড়।
রাজনীতি এখন কার্যত বিভক্ত: একদিকে সরকারপ্রধান নির্বাচনের চিন্তায় নেই, অন্যদিকে বিরোধীরা জোট নিয়ে ব্যস্ত, অথচ জনগণের সংযোগ কোথাও নেই।
এই বাস্তবতায় ‘জনতার সরকার’ হোক বা ‘জাতীয় ঐক্য’, প্রশ্ন একটাই—জনতা কোথায়? জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছাড়া রাজনীতির কোনো উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত টেকসই হয় না।
যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো এখন বিভক্ত, তারা হয়তো এক সময় একত্রে রাজপথ কাঁপিয়েছে, কিন্তু আজ বিভাজনই বেশি স্পষ্ট। আর এ সুযোগে নতুন বলয়, ব্যাকডোর সংলাপ ও নেপথ্য সমঝোতার রাজনীতি আবার ফিরে আসছে।
এই মুহূর্তে রাজনৈতিক আলোচনায় নাম বেশি উচ্চারিত হচ্ছে এমন একজন হলেন ড. ইউনূস। তিনি সরাসরি রাজনীতিতে নেই ঠিকই, কিন্তু অনেকেই তাকে ‘নন্দিত’ মুখ হিসেবে রাজনীতির সামনে আনতে চাইছে। তবে তার ভূমিকা কী হবে, তিনি আদৌ রাজনীতিতে প্রবেশ করবেন কি না, নাকি শুধু ব্যাকচ্যানেল প্রভাবেই সীমাবদ্ধ থাকবেন—তা স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে এখনকার রাজনীতিকে বলা যায়, দৃশ্যপটে নেতৃত্ব নেই, দৃশ্যপটের বাইরে হিসাবের খেলা চলছে। মাঠ খালি, তবু মঞ্চ সাজানো—অভিনয় শুরু, কিন্তু দর্শকহীন নাটক!






