রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তৃতীয় বর্ষে প্রবেশের পরও শান্তি আলোচনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় প্রকাশ্য ক্ষোভ ঝাড়লেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার (২৭ মে), নিজের মালিকানাধীন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে এক বিস্ফোরক পোস্টে তিনি বলেন, “পুতিন আসলে আগুন নিয়ে খেলছেন।” ট্রাম্পের এমন মন্তব্যের পর দুই পরাশক্তির মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
‘ভয়াবহ কিছু ঘটত, আমি না থাকলে’: ট্রাম্প দাবি করেন, তার নেতৃত্ব না থাকলে রাশিয়ার সঙ্গে এমন কিছু ঘটতো যা হতো “ভয়াবহ, একেবারে বাস্তবিক ভয়াবহ”। তবে সেই ‘ভয়াবহতা’ কিরকম হতে পারত, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি সাবেক ও বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বেশ কয়েক মাস ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের অবসানে মধ্যস্থতার নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় পুতিনের সঙ্গে একাধিকবার কথাও বলেছেন তিনি। কিন্তু সাম্প্রতিক রুশ সামরিক আগ্রাসন ট্রাম্পের সে প্রচেষ্টাকে কার্যত ব্যর্থ করে দিচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির আহ্বানে সাড়া নেই: একদিকে পশ্চিমা জোটের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পুতিনের বাহিনী ইউক্রেনের সুমি অঞ্চলে চারটি গ্রাম দখল করে নিয়েছে। একইসঙ্গে রাজধানী কিয়েভ ও অন্যান্য বড় শহরে চালাচ্ছে ভয়াবহ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাও ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় মিত্ররাষ্ট্র ও ইউক্রেন একত্রে রাশিয়াকে আহ্বান জানিয়েছে, অন্তত ৩০ দিনের নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে। কিন্তু ক্রেমলিন সে আহ্বানে গা না করে উল্টো বলছে, যুদ্ধবিরতির কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণে দেরি হতে পারে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধই সবচেয়ে ভয়াবহ- মেদভেদেভ: ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ এক পাল্টা মন্তব্যে বলেন, “ট্রাম্প যেটিকে ‘ভয়াবহ’ বলছেন, সেটি আসলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। আশা করি তিনিও সেটি বুঝতে পারছেন।”
মেদভেদেভের এমন মন্তব্য স্পষ্টতই একটি কূটনৈতিক বার্তা, যাতে ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে— যদি উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে না থাকে, পরিণতি হতে পারে সর্বনাশা।
ট্রাম্প-পুতিন টানাপোড়েনের ইতিহাস: ট্রাম্প-পুতিন সম্পর্ক বরাবরই ছিল জটিল। প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প পুতিনের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের চেষ্টা করলেও ইউক্রেন ইস্যুতে তাদের অবস্থান কখনোই পুরোপুরি মিলে যায়নি। এবার দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প শান্তিচুক্তির পক্ষে জোর দিয়ে কাজ করছেন, কিন্তু পুতিনের কৌশলগত বিলম্ব ও আগ্রাসন তার প্রচেষ্টায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেই দুই নেতা ফোনে দুই ঘণ্টা কথা বলেন। ওই আলাপে পুতিন ইঙ্গিত দেন যে, যুদ্ধবিরতি এবং সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত মস্কো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মাঠের পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন।
রাশিয়ার ট্যাকটিকস- সময়ক্ষেপণ না পদক্ষেপ: কিয়েভ এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের অভিযোগ, পুতিন শান্তিচুক্তির আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করছেন— মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন করে অগ্রসর হওয়ার প্রস্তুতি নিতে। ইউক্রেনীয় সেনারা বলছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রুশ বাহিনী নতুন করে আক্রমণ জোরদার করেছে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গোয়েন্দারা মনে করছেন, রাশিয়া এখন যুদ্ধবিরতির নামে একটি ‘ট্যাকটিক্যাল পজ’ চাইছে, যাতে অস্ত্র মজুদ ও পুনর্বিন্যাস করে আবার বড় ধরনের অভিযান শুরু করা যায়।
আগে চুক্তি চান ট্রাম্প: হোয়াইট হাউসের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করে পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এজন্য তিনি রাশিয়া ও ইউক্রেন— দুই পক্ষের ওপরই কূটনৈতিক চাপ বজায় রাখছেন। তবে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ভঙ্গিমা ও ‘হুমকিমূলক’ ভাষা কিছু মিত্র রাষ্ট্রকে অস্বস্তিতে ফেলেছে বলেও গুঞ্জন চলছে।
আলোচনা চলছে- ক্রেমলিন: রাশিয়ার প্রেস সচিবের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মস্কো একটি যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত চুক্তির খসড়া নিয়ে কাজ করছে, তবে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। চুক্তিতে যুদ্ধবিরতির নির্দিষ্ট সময়সীমা, সৈন্য মোতায়েন স্থিতি এবং অস্ত্র ব্যবহার সীমিতকরণ বিষয়ে আলোচনা চলছে।
চাপ বাড়াতে চায় ইউক্রেন: ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, তারা চাইছে একটি অবিলম্বে ও নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি। তবে তারা এও বলেছে, চুক্তির নামে যদি রাশিয়া মিথ্যাচার করে সময় নষ্ট করে, তাহলে পশ্চিমা জোটের আরও শক্ত প্রতিক্রিয়া আশা করা যায়।
যুদ্ধ না শান্তি: তিন বছর ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সমাপ্তি কোথায়— সেই প্রশ্ন এখনও উত্তরহীন। ট্রাম্প ও পুতিন মুখোমুখি অবস্থানে থাকলেও, বাস্তবতা হলো উভয়পক্ষই জানে, যুদ্ধের অবসান না হলে বিশ্ব আরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
এই পরিস্থিতিতে “আগুন নিয়ে খেলা” শুধু কথার কথা নয়, বরং মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস্তব এক সতর্ক সংকেত।






