অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের ক্রমাবনত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি নিয়ে যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তা এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভিন্ন মহলের কাছ থেকে যে প্রতিশ্রুতি, সহযোগিতা ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রত্যাশা ছিল, তা ধীরে ধীরে বিশৃঙ্খলার মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে—এমনটাই বলছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠকের পর এক অনির্ধারিত আলোচনায় মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর হতাশা খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করেন সহকর্মী উপদেষ্টাদের কাছে। একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, দেশের চলমান অস্থিরতা, সড়ক অবরোধ, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও জাতীয় সংস্কার নিয়ে কার্যত অচলাবস্থার বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে আসে। এসব পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালনে অপারগতা বা নিষ্ক্রিয়তার ইঙ্গিত দিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমি যদি কাজ করতে না পারি, তাহলে এই পদে থেকে কী লাভ?”
সূত্র জানায়, প্রধান উপদেষ্টা মনে করছেন—তিনি তাঁর ম্যান্ডেট অনুযায়ী কাজ করতে পারছেন না। সড়কে প্রতিদিন বিক্ষোভ, আন্দোলন ও রাস্তাঘাট বন্ধ থাকা পরিস্থিতিকে একটি নিয়ন্ত্রণহীন দুরবস্থার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন তিনি। আর এই অচলাবস্থায় মূল বাধা হিসেবে উঠে আসছে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কার্যকর সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থা গড়ে না ওঠা।
তিনি বলেন, “দলগুলো একসঙ্গে বসছে না, সংস্কারগুলো আটকে আছে, প্রশাসনের ভেতরেও নানা পক্ষ কাজ করছে না। এই অবস্থায় আমি যদি থাকিও, কী করতে পারব?”
প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো বাস্তব সংস্কার না হলে এবং একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ না থাকলে তাঁর দায়িত্ব পালনের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র বলছে, প্রধান উপদেষ্টা সোজাসাপ্টা বলেছেন—বর্তমান নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব কিনা, তা নিয়ে তিনি গভীর সন্দিহান। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ভোটের দিন যদি ব্যালট ছিনতাই হয় বা সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রশাসন আদৌ তা ঠেকাতে পারবে কিনা, আমি নিশ্চিত না। আর যদি নির্বাচন ভেস্তে যায়, দায় তো আমার ওপরই আসবে।”
এমন মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি আভাস দেন যে, দায়িত্বে থেকে যদি ন্যূনতম সাফল্য নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে পরিণামে তাঁর ব্যক্তিগত ও নৈতিক দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এই আলোচনার এক পর্যায়ে অধ্যাপক ইউনূস একটি প্রস্তাবনাও দেন—তিনি সরতে প্রস্তুত। উপদেষ্টাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “আপনারা যদি আরেকটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে চান, তাহলে করেন। আমি চলেও যেতে পারি।” তাঁর এই বক্তব্য শুনে উপস্থিতরা হতবাক হলেও, কেউ তাৎক্ষণিকভাবে বিরোধিতা করেননি।
এদিকে, বৈঠকের সময় প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণের প্রস্তাবও আসে। সেখানে তিনি সরকারের অসহযোগিতা, রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে খোলামেলা বক্তব্য দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। যদিও শেষপর্যন্ত ভাষণ প্রচারের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবু একটি খসড়া তৈরি হয় বলে জানা গেছে।
এই ঘটনার পর সন্ধ্যায় যমুনায় যান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে একান্তে দীর্ঘ সময় আলোচনা করেন এবং পদত্যাগ সংক্রান্ত গুঞ্জন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রাতেই বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “দেশের চলমান পরিস্থিতি, স্যারের তো পদত্যাগের একটা খবর আমরা সকাল থেকেই শুনছি। সে বিষয়েই স্যারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম।”
তিনি আরও জানান, অধ্যাপক ইউনূস তাঁকে বলেন, “আমি যদি কাজ করতে না পারি, তাহলে আর থেকে কী লাভ? পরিবর্তনের জন্য যে জায়গা থেকে আমাকে ডাকা হয়েছিল, সেখানে তো কোনো অগ্রগতি নেই। বরং আমাকে জিম্মি করে ফেলা হচ্ছে।”
নাহিদ ইসলাম তাঁকে অনুরোধ করেন যেন তিনি এই মুহূর্তে পদত্যাগের মতো সিদ্ধান্ত না নেন। তাঁর ভাষায়, “জাতীয় নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় রেখে আমরা চাই স্যার শক্ত থাকুন, সকল রাজনৈতিক দলকে এক জায়গায় আনতে কাজ চালিয়ে যান।”






